দেবীগঞ্জে স্বাস্থ্য সনদ ছাড়াই পশু জবাই, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

আকতারুজ্জামান , দেবীগঞ্জ (পঞ্চগড়) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

দেবীগঞ্জে স্বাস্থ্য সনদ ছাড়াই পশু জবাই, বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

ফাইল ফটো

পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে উদ্যোগ নেওয়ার পর কিছুদিন মাংস ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাড়া দেখা গেলেও পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে আবারও এ নিয়ম মানায় অনীহা দেখা দিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক মাংস ব্যবসায়ী নিয়মিত পশুর স্বাস্থ্য সনদ নিচ্ছেন না। কেউ সর্বশেষ সনদ নিয়েছেন প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, আবার কয়েকজন এখন পর্যন্ত একবারও সনদ নেননি। এতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত পশু জবাই করে মাংস বাজারজাত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেবীগঞ্জ পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গরু জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সনদ গ্রহণের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক ব্যবসায়ী তা নিয়মিত অনুসরণ করছেন না। সর্বশেষ সনদ গ্রহণের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কয়েকজন নিয়মিত সনদ নিলেও অনেক ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে সনদ গ্রহণের মধ্যে দীর্ঘ বিরতি রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, চিলাহাটি ইউনিয়নের মো. আজিম উদ্দিন সর্বশেষ স্বাস্থ্য সনদ নিয়েছেন ১৬ আগস্ট এবং রাজু ইসলাম ৭ আগস্ট। ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের সর্বশেষ সনদ নেওয়ার পর যথাক্রমে প্রায় ১৭ ও ২৬ দিন পার হয়েছে। দেবীগঞ্জ পৌর এলাকার এলএসডি মোড়ের ইউসুফ সর্বশেষ স্বাস্থ্য সনদ নিয়েছেন ১৮ আগস্ট। মধ্যবাজারের আনিছা সনদ নিয়েছেন ৩০ আগস্ট। একই এলাকার ফয়জুল বাইরে থেকে মাংস এনে বিক্রি করছেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন।

সুন্দরদিঘী ইউনিয়নের হাফেজ উদ্দিন সর্বশেষ সনদ নিয়েছেন ২১ আগস্ট। দণ্ডপাল ইউনিয়নের ইউনুস আলী ২৪ আগস্ট এবং দেবীডুবা ইউনিয়নের নাজিরুল, মালেক ও ভাদু যথাক্রমে ২২, ২৭ ও ৩১ আগস্ট সর্বশেষ স্বাস্থ্য সনদ নিয়েছেন। অন্যদিকে, সোনাহার ইউনিয়নের তৌহিদুল ও দণ্ডপাল ইউনিয়নের রনি ইসলাম এখন পর্যন্ত কোনো স্বাস্থ্য সনদ নেননি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। শালডাঙা, পামুলি ও চেংঠী হাজরাডাঙ্গা ইউনিয়নে নিয়মিত গরু জবাই হয় না বলেও জানা গেছে।

এর আগে পশু জবাইয়ের আগে প্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সনদ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দেবীগঞ্জের মাংস ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুদিন সনদ নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকেও ব্যবসায়ীদের সচেতন করা এবং নিয়ম মেনে পশু জবাইয়ের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ব্যবসায়ী আবারও নিয়মিত সনদ গ্রহণ থেকে সরে গেছেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শুধু ব্যবসায়ীদের সচেতন করলেই এ নিয়ম বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন, জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য সনদ যাচাই নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক তদারকি প্রয়োজন। তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৌর শহর ও ইউনিয়ন পর্যায়ের মাংসের দোকানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত পশু জবাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জবাইয়ের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাংস বিক্রি না করা, বাইরে থেকে মাংস এনে বিক্রি করা, সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফলে স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণে ব্যবসায়ীদের অনীহা এবং পর্যাপ্ত প্রশাসনিক তদারকির অভাব ভোক্তাদের জন্য নতুন করে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। স্থানীয় ভোক্তাদের দাবি, মাংস ব্যবসায়ীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনেরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে সনদ নিচ্ছেন না, তাদের সতর্ক করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং জোরদার করা দরকার।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, “জনবল সংকটের কারণে আমাদের নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এরপরও জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। এ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ সাহা বলেন, “আমি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব। নিয়মিত পশুর স্বাস্থ্য সনদ গ্রহণের বিষয়টি যেন কার্যকরভাবে প্রচলিত হয়, সে বিষয়ে আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।

Link copied!