সুশাসনের শক্ত ভিত: পেশাদার ও নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিসেই সরকারের আসল সাফল্য :-সিয়াম রশিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

সুশাসনের শক্ত ভিত: পেশাদার ও নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিসেই সরকারের আসল সাফল্য :-সিয়াম রশিদ

ফাইল ফটো

একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রশাসনিক মেরুদণ্ড দাঁড়িয়ে থাকে তার সিভিল সার্ভিস বা আমলাতন্ত্রের ওপর। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সরকার নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে পরিবর্তিত হতে পারে ; এটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যেও রাষ্ট্রের পলিসি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক সেবার নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখে পেশাদার সিভিল সার্ভিস। তাই সিভিল সার্ভিসে পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর সুশৃঙ্খল নিয়ম নয়—এটি সরকারের কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতাসীন সরকারকেই জনগণের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তোলে।

সিভিল সার্ভিসের প্রাথমিক কাজ হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের নেওয়া সিদ্ধান্ত ও জনকল্যাণমূলক নীতিগুলোকে মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা। যখন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শে প্রভাবিত হন, তখন সুশাসনের প্রথম শর্ত ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ ক্ষুণ্ণ হয়। প্রকৃতপক্ষে, একটি নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের অর্থ হলো এমন এক প্রশাসনিক পরিবেশ, যেখানে কর্মকর্তারা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সংবিধান, আইনের শাসন, জনস্বার্থ ও নিজেদের মেধার ওপর ভিত্তি করে দায়িত্ব পালন করবেন। এই ব্যবস্থা প্রমাণ করে—দলের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ বড় ।

প্রশাসনে নিরপেক্ষতা  বজায় থাকলে সরকারি কাজের পারফরম্যান্স আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পায়। এর পেছনে প্রধান প্রধান কারণগুলো হলো:

* দল নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্বকে প্রশ্রয় দেয় না। ফলে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হয়, দুর্নীতি কমে এবং বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার সুনিশ্চিত হয়।

* নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ আমলারা নির্ভীকভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে । এতে করে আবেগপ্রসূত বা অকার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

*  আমলারা যখন নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সমান ও দ্রুত সেবা প্রদান করেন, তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পায় এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের জনভোগান্তি অবসান ঘটে।

* দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালিত হলে তা নির্ধারিত বাজেট ও মেয়াদের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়, যা রাষ্ট্রের সম্পদের সাশ্রয় ঘটায়।

গণতন্ত্রে জনগণের আস্থা অর্জন করে পুনঃনির্বাচিত হওয়াই রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে। অনেক সময় ধারণা করা হয়, প্রশাসনে নিজেদের অনুগত লোক বসালে হয়তো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং দলীয় সুবিধা আদায় করা যায়। তবে এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ও আত্মঘাতী একটি দৃষ্টিভঙ্গি। অদক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে অনুগত আমলাতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনে স্থবিরতা, অনিয়ম ও চরম দুর্নীতি তৈরি করে—যার সার্বিক দায়ভার দিনশেষে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির ওপরই এসে পড়ে।

অপরদিকে, একটি পেশাদার আমলাতন্ত্র যখন সুশাসন নিশ্চিত করে দেশের কোণায় কোণায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়, তখন জনগণ তার প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করে। নাগরিকরা যখন কোনো ধরনের হয়রানি ও বৈষম্য ছাড়াই সরকারি দফতর থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়, তখন তারা সরকারের সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে। অর্থাৎ, নিরপেক্ষ সিভিল সার্ভিসের চমৎকার পারফরম্যান্সই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় ও কার্যকর রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশসহ যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের টেকসই সমৃদ্ধির জন্য সিভিল সার্ভিসকে পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক নিয়োগ, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগ্যতার পরিবর্তে  মেধা, জ্যেষ্ঠতা, সততা ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পেশাদার আমলাতন্ত্র সরকারের  কোনো বাধা নয়, বরং সরকারের জনকল্যাণমুখী স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের প্রধান নিয়ামক। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত সিভিল সার্ভিসকে তার নিজস্ব পেশাদারিত্ব ও আইনি স্বকীয়তায় পরিচালিত হতে দেওয়া। কারণ দিনশেষে সিভিল সার্ভিসের ভালো পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করে সরকারের জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা এবং ইতিহাসের পাতায় তার স্থায়ী অবস্থান।

Link copied!