হিমালয়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে ইমরানের চোখ এবার এভারেস্টের চূড়ায়

নাজিউল্লাহ ভূইয়া , কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

হিমালয়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে ইমরানের চোখ এবার এভারেস্টের চূড়ায়

হিমালয় দেখার স্বপ্ন থেকেই যাত্রা শুরু। তবে নেপালে গিয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প দেখে ফিরে আসাই লক্ষ্য ছিল না কেরানীগঞ্জের তরুণ মো. ইমরান হোসেনের। পাহাড়ের আরও দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা নিয়ে শুরু করেছিলেন ১৬ দিনের অভিযান। সেই যাত্রায় পৌঁছেছেন এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে, পেরিয়েছেন চো লা ও রেনজো লা পাস, উঠেছেন গোকিও রি চূড়ায়। বরফে ঢাকা পাহাড়, পাথুরে পথ আর হিমশীতল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে হিমালয়ের এই অভিযানের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন তিনি। কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নের  কাঠালতলীর বাসিন্দা  মো. ইমরান হোসেনের কাছে পাহাড়ে যাওয়া নিছক ভ্রমণ নয়। এর পেছনে রয়েছে নিজেকে চেনার, নিজের সামর্থ্য যাচাই করার এবং অজানাকে কাছ থেকে দেখার আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে অভিযানের আগে নিয়মিত হাঁটতেন প্রায় ১০ কিলোমিটার। বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতেন, নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন খাদ্যাভ্যাসও।

কারণ, পাহাড়ের পথে শুধু ইচ্ছাশক্তি নিয়ে নামলেই হয় না; প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা ও যথাযথ প্রস্তুতি। হিমালয়ের পথে এই যাত্রা শেষ হলেও ইমরানের স্বপ্নের পরিধি আরও বড়। সামনে পেরুর ঐতিহাসিক ইনকা ট্রেইল, আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত তানজানিয়ার কিলিমানজারো। আর তাঁর স্বপ্নের চূড়ান্ত গন্তব্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট। সেখানে পৌঁছানোর পথ সহজ নয়। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন। ইমরানের ধারণা, এভারেস্ট অভিযানে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। তাই স্বপ্ন পূরণে পৃষ্ঠপোষকতার আশাও করছেন তিনি। আপাতত তাঁর ঝুলিতে রয়েছে হিমালয়ের দুর্গম পথ পেরোনোর অভিজ্ঞতা, বরফঢাকা পর্বতের স্মৃতি আর নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস। কেরানীগঞ্জের অদ্যম  এই সাহসী তরুণের চোখ এখন আরও উঁচুতেএভারেস্টের চূড়ায়।

স্বপ্নের পথে প্রস্তুতিঃহিমালয় অভিযানে যাওয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে নিয়মিত হাঁটাচলার অভ্যাস গড়ে তোলেন ইমরান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০ কিলোমিটার হাঁটার পাশাপাশি বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে বারবার ওঠানামা করতেন। কখনো প্রায় ১০ তলা পর্যন্ত উঠে আবার নিচে নামতেন। অভিযানের আগে টানা প্রায় ১০ দিন এভাবে অনুশীলন করেছেন তিনি।দীর্ঘ পথ হাঁটার জন্য শুধু পায়ের শক্তি যথেষ্ট নয়। ক্লান্তি সামলে এগিয়ে চলা, শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখা এবং প্রতিকূল পরিবেশে মনোযোগ ধরে রাখাও জরুরি। সেই উপলব্ধি থেকেই শারীরিক অনুশীলনের পাশাপাশি খাবারের দিকেও নজর দেন ইমরান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ এনে পুষ্টিকর, বিশেষ করে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করেছেন।তবে উচ্চ পর্বতাভিযানের প্রস্তুতি কেবল হাঁটাচলা ও খাদ্যাভ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়।

পাঁচ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় অক্সিজেনের প্রাপ্যতা কমে যায়। এতে উচ্চতাজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। তাই পর্যাপ্ত সময় নিয়ে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত পরামর্শ গ্রহণ এবং নিরাপত্তার পরিকল্পনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।ইমরানের মতে, পাহাড়ে যাওয়ার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়াও জরুরি। দুর্গম পথে ক্লান্তি, ভয় কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজের সামর্থ্য বুঝে এগোতে হবে। প্রয়োজনে থেমে যাওয়া কিংবা ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়াও অভিযাত্রীর দায়িত্ব।

দুর্গম পথ পেরিয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পঃ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে জিপে ফাপলু পৌঁছাতে ইমরানের তিন দিন কেটে যায়। এরপর শুরু হয় মূল পদযাত্রা। পাহাড়ি জনপদ, পাথুরে পথ ও খাড়া চড়াই পেরিয়ে এগিয়ে যান নামচে বাজারের দিকে। প্রায় ৩ হাজার ৪৪০ মিটার উচ্চতার এই জনপদ হিমালয় অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থলগুলোর একটি।লুকলার বহুল ব্যবহৃত পথের পরিবর্তে ভিন্ন রুটে যাত্রা করায় পাহাড়ের ভিন্ন রূপ দেখার সুযোগ পান তিনি। পথের প্রতিটি বাঁকে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা; কখনো কঠিন চড়াই, কখনো বরফঢাকা পাহাড়, আবার কখনো হিমশীতল বাতাসের মধ্যে দীর্ঘ সময় হাঁটা।

অভিযানের অন্যতম প্রধান গন্তব্য ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উঁচু এভারেস্ট বেস ক্যাম্প। সেখানে পৌঁছানোর পরও যাত্রা থামাননি ইমরান। অতিক্রম করেন প্রায় ৫ হাজার ৪২০ মিটার উচ্চতার চো লা পাস। এরপর গোকিও অঞ্চলের বরফঘেরা লেক দেখে ওঠেন প্রায় ৫ হাজার ৩৫৭ মিটার উঁচু গোকিও রি চূড়ায়। তাঁর অভিযানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৩৪৫ মিটার উচ্চতার রেনজো লা পাস অতিক্রম করা।উঁচু পাহাড়ে আবহাওয়া দ্রুত বদলে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় হাঁটা, ঠান্ডার মধ্যে শরীরের শক্তি ধরে রাখা এবং উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রতিটি ধাপই ছিল চ্যালেঞ্জের। এসব অভিজ্ঞতা ইমরানকে পাহাড়ি অভিযানের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করেছে।

তীব্র ঠান্ডায় মনে পড়েছে পরিবারের কথাঃ অভিযানের কঠিন মুহূর্তগুলোতে ইমরানের মনে পড়েছে বাবা-মা ও ভাইবোনের কথা। বিশেষ করে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ও গোকিও রি চূড়ায় দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যদের কথা বেশি মনে হয়েছে বলে জানান তিনি।ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো সময় তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। এমন ঠান্ডায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া ছিল কঠিন অভিজ্ঞতা। পরিবারের দোয়া ও ভালোবাসা তাঁকে সাহস জুগিয়েছে বলে জানান তিনি। বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এই অভিযাত্রী।

সামনে ইনকা ট্রেইল, কিলিমানজারো ও এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন ঃহিমালয় অভিযান শেষ হলেও নতুন গন্তব্যের পরিকল্পনা করছেন ইমরান। প্রথমে পেরুর ঐতিহাসিক ইনকা ট্রেইলে ট্রেকিং করতে চান। এরপর লক্ষ্য আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত তানজানিয়ার কিলিমানজারো। সবশেষে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর স্বপ্ন তাঁর।তবে এভারেস্ট জয় শুধু সাহসের পরীক্ষা নয়; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, উচ্চতাজনিত পরিবেশে অভিজ্ঞতা, বিশেষায়িত সরঞ্জাম, দক্ষ দল এবং যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা। সেই সঙ্গে রয়েছে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন। ইমরানের হিসাব অনুযায়ী, এভারেস্ট অভিযানে প্রায় ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। এত অর্থের সংস্থান তাঁর জন্য কঠিন। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পৃষ্ঠপোষকতা করলে এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে চান তিনি।

নিজের অর্জন কেরানীগঞ্জের মানুষের জন্য উৎসর্গঃনিজের অর্জনকে নিছক ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখতে চান না ইমরান হোসেন। হিমালয়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সাফল্য তিনি উৎসর্গ করতে চান প্রিয় কেরানীগঞ্জের মানুষের জন্য। পরিচিত জনপদ থেকে হাজার হাজার মিটার উঁচু বরফঢাকা পাহাড়ে পৌঁছানো তাঁর কাছে কেবল একটি অভিযান নয়, বরং নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস।এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকে গোকিও রি প্রতিটি পদক্ষেপ তাঁকে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছে। সামনে দীর্ঘ পথ, কঠিন প্রস্তুতি আর বড় অঙ্কের অর্থের চ্যালেঞ্জ। তবু স্বপ্নের পথ থেকে সরে আসতে চান না এই দুর্দম তরুণ।ইমরানের স্বপ্ন, একদিন এভারেস্টের বরফঢাকা চূড়ায় পা রেখে নিজের সাফল্যের পাশাপাশি বিশ্বদরবারে তুলে ধরবেন প্রিয় কেরানীগঞ্জের নাম। হতে চান কেরানীগঞ্জের প্রথম সন্তান, যিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করে রচনা করবেন এক নতুন ইতিহাস। তাঁর কাছে এভারেস্টের চূড়া কেবল একটি পর্বতশৃঙ্গ নয়, এটি নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি জন্মভূমির জন্য গৌরব বয়ে আনার এক অনন্য প্রত্যয়।

Link copied!