ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের ৪৩ বছরের পাঠ, প্রশ্ন, মুক্তবুদ্ধি ও প্রজন্ম নির্মাণের ইতিহাস
স্বাধীন চৌধুরী
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সময়ের মধ্যে জন্ম নেয়, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেই সময়ের একটি পরিচয় হয়ে ওঠে। কোনো কোনো সংগঠনের ইতিহাস তার প্রতিষ্ঠাবর্ষ, প্রতিষ্ঠাতা, কমিটি, কার্যালয় কিংবা অর্জনের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে; আবার কোনো কোনো উদ্যোগের ইতিহাস ছড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, চিন্তায়, প্রজন্মের বোধে এবং একটি শহর বা নগরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সত্তায়।
ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’ তেমনই এক বিরল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
১৯৮৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ শহরের সি কে রোডের প্রেসক্লাব চত্বরে যে পাঠচক্রের প্রথম আসর বসেছিল, ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সেই যাত্রার ৪৩ বছর পূর্ণ হলো। ‘বীক্ষণ’ আজ তার ৪৪তম বছরে পদার্পণ করল। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতি শুক্রবারের ধারাবাহিক পাঠ, আলোচনা, বিতর্ক ও মুক্তবুদ্ধিচর্চার মধ্য দিয়ে একটি পাঠচক্রের পরিচয় অতিক্রম করে ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। পাঠচক্র'র শুরু থেকে এর ধারাবাহিকতা এতটাই দৃঢ় যে প্রতিকূল আবহাওয়া, স্থান পরিবর্তন কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিও বীক্ষণ'কে থামাতে পারেনি।
তাই ‘বীক্ষণ’-এর জন্মদিন বা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন শুধু নয় এই দিন; ময়মনসিংহের মুক্তচিন্তার দীর্ঘ অভিযাত্রাকে স্মরণ করারও দিন। এই পাঠচক্র প্রশ্ন করার অধিকার, যুক্তির প্রতি আস্থা এবং জ্ঞানের প্রতি মানুষের অন্তহীন আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানোর দিন।
যে মাটিতে অঙ্কুরিত হয়েছিল 'বীক্ষণ' বীজ
‘বীক্ষণ’-এর ইতিহাস বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক পরিবেশ,পরিমণ্ডল। মৈমনসিংহ গীতিকার ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, কবিতা, সংগীত, নাটক ও মননশীলতার দীর্ঘ ধারায় ময়মনসিংহ বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ড। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শহরের বিভিন্ন আড্ডা, পাঠচক্র, সাহিত্যিক সমাবেশ ও মুক্তবুদ্ধির পরিসর নতুন প্রজন্মের লেখক-শিল্পীদের তৈরি করেছে।
তাজমহল রেস্তোরাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাহিত্যিক আড্ডায় কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি মুশাররাফ করিম, শামসুল ফয়েজ, সেলিম মাহমুদ, গাউসুর রহমান, আশরাফ মীর, সোহরাব পাশা,আতাউল করিম,তসলিমা নাসরিন, নাসরীন জাহান প্রমুখের মতো লেখকদের দীর্ঘ তালিকার উপস্থিতির ইতিহাস সুবিদিত।
তখনকার সাংস্কৃতিক আবহে ১৯৮০ সালের ২১ মে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কবি মুশাররাফ করিম এবং ছড়াকার ড. আতাউল করিম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা আর তা প্রাণময় তথা জীবন্ত রাখা এক নয়। সংগঠনকে প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত করার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা। প্রয়োজন এমন একটি জায়গা, যেখানে শুধু অনুষ্ঠান করবে না—পড়বে, শুনবে, ভাববে, প্রশ্ন করবে। সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় ‘বীক্ষণ’। কবি শামসুল ফয়েজ-এর প্রস্তাবিত নাম 'বীক্ষণ' সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়।
একটি পাঠচক্রের শুরু। ১৯৮৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। এক বিকেলে ময়মনসিংহ শহরের সি.কে. রোডের টিন শেডের প্রেসক্লাব চত্বরে মুক্তবুদ্ধিচর্চায় অগ্রণী সৃজন ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের আহবানে, ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পের ব্যানারে একত্রিত হয়েছিলেন। বসেছিল ‘বীক্ষণ’-এর প্রথম আসর।
প্রথম আসরেই যে মননশীলতার পরিসর তৈরি হয়েছিল, তার গুরুত্ব পেছন ফিরে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। সেই আসরে বক্তব্য রেখেছিলেন এবং সৃজনশীল ও মননশীল লেখা পাঠ করেছিলেন পরবর্তীতে স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রয়াত বরেণ্য বুদ্ধিজীবী গোলাম সামদানী কোরায়শী,স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রয়াত বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, লেখক অধ্যাপক যতীন সরকার, তরুণ গল্পকার আতা সরকার এবং তরুণ কবি শামসুল ফয়েজ। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কবি মুশাররফ করিম সেদিন উপস্থিত থাকতে পারেননি; তাঁর অনুপস্থিতিতে সাধারণ সম্পাদক তরুণ ছড়াকার আতাউল করিম সভাপতিত্ব করেছিলেন।
পাঠচক্রের প্রথম দিনে গোলাম সামদানী কোরায়শী ও যতীন সরকারের মতো বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত থেকে সংগঠনটির অভিযাত্রায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এদিন শুধু সাহিত্যের আড্ডা ছিল না। ছিল মুক্ত চিন্তার বিকাশে পথ তৈরি করা, এর ভেতরে নৈতিক ভাবনায় মনন, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার এক বীজ বপন করা হয়েছিল। ‘বীক্ষণ’ নামের মধ্যেও সেই দর্শন নিহিত। বীক্ষণ মানে শুধু দেখা নয়। গভীরভাবে দেখা। উপরিতল অতিক্রম করে দেখা। প্রচলিত ব্যাখ্যার আড়ালে থাকা সত্যকে দেখার চেষ্টা করা। অর্থাৎ চোখের দেখা থেকে বোধের দেখা—এই যাত্রাই বীক্ষণ।
পাঠচক্র, কিন্তু শুধু সাহিত্য নয়
‘বীক্ষণ’-এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য, মানে শুরু থেকেই ছিল এর বিষয়বৈচিত্র্য। সাহিত্য অবশ্যই তার অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু সাহিত্যকে জীবনের বাইরে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ হিসেবে দেখা হয়নি। তাই সাহিত্য থেকে ইতিহাস, ইতিহাস থেকে রাজনীতি, রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, অর্থনীতি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে দর্শন—আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত হয়েছে।
বীক্ষণে সাহিত্য ও স্বরচিত পাঠের পাশাপাশি ভ্রমণ, পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক সংকট, যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং সমকালীন আলোচিত ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এমনকি হলি আর্টিজান হামলার প্রসঙ্গ নিয়েও পাঠচক্রে আলোচনা হয়েছিল। এই বিস্তারই ‘বীক্ষণ’-কে প্রচলিত সাহিত্যসভা থেকে আলাদা করেছে।
কারণ সাহিত্য জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হলে, তা কেবল অলংকার হয়ে যায়, কিন্তু জীবনকে যদি সাহিত্যের আলোয় দেখা যায়,তবে সাহিত্য হয়ে ওঠে বোধের মাধ্যম। ‘বীক্ষণ’ সেই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে।
সক্রেটিস, প্রশ্ন এবং বীক্ষণের দর্শন
‘বীক্ষণ’-এর সঙ্গে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক ঐতিহ্যের তুলনা করতে গেলে আগে আসে সক্রেটিসের প্রশ্নপদ্ধতি। মনে রাখা প্রয়োজন—প্লেটো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Academy এবং অ্যারিস্টটল Lyceum; সক্রেটিস নিজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেননি। তাঁর শক্তি ছিল অন্য জায়গায়—সংলাপে। তিনি প্রশ্ন করতেন। উত্তর শুনতেন। আবার প্রশ্ন করতেন। মানুষের বিশ্বাসের ভিত পরীক্ষা করতেন। মানুষকে নিজের অজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করাতেন।
‘বীক্ষণ’-এর শক্তিও অনেকটা ওখানে।
এখানে বক্তা কথা বলেন, শ্রোতা শোনেন; কিন্তু শেষ কথা বক্তার নয়। প্রশ্ন করার অধিকার সবার। কোনো বিষয়কে একমাত্রিকভাবে না দেখে তার নানা দিক নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। ‘বীক্ষণ’কে প্লেটোর Academy বা অ্যারিস্টটলের Lyceum-এর সঙ্গে ঐতিহাসিক সমতুল্য বলা ঠিক না হলেও আধুনিক বাংলার এক অনানুষ্ঠানিক সক্রেটিসীয় সংলাপের পরিসর বলা যায়। এখানে কোনো ডিগ্রি দেওয়া হয় না। কোনো পরীক্ষা নেই। কোনো সার্টিফিকেটও নেই। কিন্তু আমরা বলি, এখানে অন্যরকম এক শিক্ষাজগত আছে। কারণ শিক্ষার সবচেয়ে প্রাচীন রূপটি সম্ভবত ছিল—মানুষের সঙ্গে মানুষের কথোপকথন।
ব্রহ্মপুত্রের পাড় থেকে নগরীর এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
সময়ের সঙ্গে ‘বীক্ষণ’-এর আসর ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্রপাড়ে, এক স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করে। ১৯৯৩ সালের দিকে সাহিত্য সংসদের কার্যক্রমের জন্য জয়নুল আবেদিন উদ্যান রোডের জায়গা বরাদ্দ,যা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক নামে অভিহিত। পরবর্তীতে এখানে মুক্তমঞ্চ গড়ে তোলা হয়েছিল, এখন নেই; এ তথ্যও নগরবাসী অবগত। সেই মুক্তমঞ্চে দীর্ঘদিন কবিতা, গান ও সমকালীন আলোচনা অনুষ্ঠানের একটি পরিচিত স্থান হয়ে ওঠে।
এখন জায়গাটির নিজস্বতা সংক্রান্ত সরকারি সংকটের মুখোমুখি আমরা। কিন্তু বড় সত্য হচ্ছে যে, ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ সবসময় বেঁচে আছে তার কর্মে,নামে নয়। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ তথা বীক্ষণ পাঠচক্র আয়োজন অনুষ্ঠানের সময় সময় স্থান পরিবর্তন কোন স্থায়ী বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি কখনো। কারণ আত্মাকে ধারণ করে চলায় কোনকিছু হারাবার থাকে না, মূলধারার সংগঠনকর্মীদের সাথে সংগঠন হাঁটে, সাথে সাথে চলে। স্থান কোন বিষয় নয়, মূল বিষয় হচ্ছে সংগঠনকে আত্মায় ধারণ করা।
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ঐতিহ্যবাহী বিপিন পার্কের সবুজাভ খোলা আকাশের নিচে বসা ‘বীক্ষণ’ চলছে তার চৈতন্যের গতিতে। এই নগরীর দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে আছে বীক্ষণ। নদী প্রবাহিত হয়েছে। ঋতু বদলেছে। মানুষ বদলেছে। শহর বদলে নগর হয়েছে কিন্তু শুক্রবার এসেছে, আর বীক্ষণ আসর বসেছে, বসছেই। এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতা আমাদের অনন্য অর্জন।
মাইলফলকের পর মাইলফলক
একটি সাপ্তাহিক পাঠচক্রের বড় সম্পদ যথার্থ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারা। ‘বীক্ষণ’ সেই ধারাবাহিকতায় বারবার মাইলফলক তৈরি করেছে। ১৯৯৩ সালের ৬ আগস্ট পালিত হয় ৫০০তম আসর। প্রধান অতিথি ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় ১০০০তম আসর। ২০১৪ সালের ৬ নভেম্বর উদ্যাপিত হয় ১৬০০তম আসর। ১৬০০তম আসরে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানসহ শতাধিক কবি-লেখক অংশ নেন।
২০১৮ সালের ২৫ মে অনুষ্ঠিত ১,৭৮৫তম আসর।সে দিনের অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনে দীর্ঘ সময় ধরে চলছে বীক্ষণ, কোনো শুক্রবার আসর বন্ধ হয় না এ খবর বিশেষভাবে ওঠে আসে গণমাধ্যমের সংবাদে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় মাত্র দুই বা ৫ জন উপস্থিত থাকলেও আসর হয়েছে। এমনকি ময়মনসিংহের লেখকদের সাথে ঢাকায় অবস্থানরত কবি-লেখকদের উপস্থিতিতে একুশে ‘বীক্ষণ’ আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘বীক্ষণ’এর দর্শন দারুণভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার বহমান কর্মযজ্ঞে। আসর মানে খুব ভিড় নয়; আসর মানে এক নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় পথচলা। এখানে সমাজ ও সভ্যতার প্রয়োজন নিয়ে কথা হয়। দুজন হলেও আলোচনা হতে পারে। কারণ এখানে চিন্তার মূল্য উপস্থিতির সংখ্যা দিয়ে নিরূপণ হয় না।
শামসুর রাহমান থেকে নতুন প্রজন্মের কবি-লেখক
১৯৯৮ সালের ৭৬৯তম আসর ‘বীক্ষণ’-এর ইতিহাসে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই আসরে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান। তাঁর সাথে ছিলেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, ছড়াকার আতাউল করিম এবং তরুণ কবি টোকন ঠাকুর, তরুণ সাংবাদিক হাসানুজ্জামান সাকী, ওই বয়সী প্রতিভাবান এক তরুণ দল। ময়মনসিংহের আশেপাশের জেলা থেকে এসেছিলেন লেখককুল। এ শুধু একজন বিখ্যাত কবির উপস্থিতির ঘটনা নয়। এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আজ বিস্তারিত। তেমনি ১৬০০তম আসরে হাবীবুল্লাহ সিরাজী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, নাসরীন জাহানের অংশগ্রহণও সেই ধারারই বিস্তার।
তাঁদের আগমন শুধু বীক্ষণকে সমৃদ্ধ করেনি; ময়মনসিংহের তরুণ লেখকদেরও বৃহত্তর সাহিত্যজগতের সঙ্গে সম্মিলিত করেছে, পরিচয় ঘটিয়েছে। ময়মনসিংহের একটি নিয়মিত পাঠচক্র জাতীয় সাহিত্যভুবনের বিশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। ঢাকা ও ময়মনসিংহের মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব কমিয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের কবি-লেখকদের জন্য তৈরি করেছে এক উন্মুক্ত মঞ্চ।
১৬০০তম আসরে হাবীবুল্লাহ সিরাজী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, নাসরীন জাহানের অংশগ্রহণও সেই ধারারই বিস্তার।তাঁদের আগমন শুধু বীক্ষণকে সমৃদ্ধ করেনি; ময়মনসিংহের তরুণ লেখকদেরও বৃহত্তর সাহিত্যজগতের সঙ্গে সম্মিলিত করেছে,পরিচয় ঘটিয়েছে।
প্রজন্ম তৈরিতে বীক্ষণের নীরব চাষবাদ
কোনো পাঠচক্র কতজন বিখ্যাত অতিথিকে আনতে পেরেছে, তা দিয়ে যেমন সবকিছুকে সবসময় মূল্যায়ন করা যায় না, দেখতে হয়—সেখানে কতজন নতুন পাঠক তৈরি হচ্ছে, কতজন তরুণকে ভাবতে শিখিয়েছে, কতজনকে নিজের কথা বলবার সাহস দিয়েছে। এইখানে ‘বীক্ষণ’ যথার্থ উত্তরাধিকার। উল্লেখ্য, প্রকাশিত বিভিন্ন স্মৃতিচারণে এসেছে, অনেক তরুণ কবি-লেখক বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন এবং পরে তারা বাংলা সাহিত্যে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
এক সময়ের তরুণেরা পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছেন আলোচক, সংগঠক, লেখক। এভাবেই তাঁদের জায়গায় এসেছে নতুন প্রজন্ম।এই হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উত্তরাধিকার—মানুষ থেকে মানুষে চিন্তার সঞ্চালন।বই উত্তরাধিকার বহন করে, কিন্তু পাঠক তৈরি না হলে বইয়েরও ভবিষ্যৎ থাকে না। ‘বীক্ষণ’ সেই পাঠক তৈরির কাজটিও করেছে,করে যাচ্ছে।
করোনাকাল: তখনও বন্ধ হয়নি বীক্ষণ
চার দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল করোনা মহামারি। সামাজিক দূরত্ব যখন মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্ককে থামিয়ে দিয়েছিল, তখন বীক্ষণও তার প্রচলিত ভৌত পরিসর থেকে সরে গিয়ে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে পাঠচক্র চালু রাখে। সে দিন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক স্বাধীন চৌধুরী'র দৃঢ় ও অবসম্ভাবী আহবানের প্রতি সাড়া দিয়েছিলেন সংগঠনের সদস্যবৃন্দ। এর মাধ্যমে মূলত বীক্ষণ পাঠচক্র সোশাল মিডিয়ায় প্রবেশ করে এবং বীক্ষণ তৈরি করে বৈশ্বিক যোগাযোগের সেতুবন্ধন। করোনাকালের সংকট ফুরিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট স্থানে বীক্ষণ আবার শুরু হয়েছে, কিন্তু অনলাইনে যুক্ত আছেই সকল সময়।
যা শুধু প্রযুক্তিগত অভিযোজন নয়; একটি দর্শনের প্রমাণ।
বীক্ষণ শুধু একটি অনুষ্ঠানের স্থান নয়। স্থান বা জায়গা বদলাতে পারে, মাধ্যম বদলাতে পারে; হ্যাঁ বক্তা বদল হয়, শ্রোতারও বদল হয়—কিন্তু জিজ্ঞাসা বা প্রশ্নের প্রয়োজনীয়তা বদলায় না। যেমন, করোনার মতো সংকট-সময়ে টিকে থাকবার প্রশ্ন আরও জরুরি হয়ে ওঠেছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানুষের পাশে থাকা, আতঙ্ক মোকাবিলা, সামাজিক দায়িত্ব—জীবনের জরুরি প্রশ্নগুলো তখন বীক্ষণের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। অর্থাৎ সংকটের সময়েও জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি বীক্ষণ।
৪৩ বছর পর: কেন এখনও প্রয়োজন বীক্ষণ?
এই প্রশ্নের উত্তর আজ আরও জরুরি। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে। স্মার্টফোন মানুষের সামনে মুহূর্তে হাজার তথ্য এনে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতামত তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর তৈরি করতে পারছে সেকেন্ডে। কিন্তু তথ্যের আধিক্য কি মানুষকে জ্ঞানী করতে পারছে? নিশ্চয়ই সবসময় নয়; কারণ তথ্য জানা আর সত্য বোঝা এক বিষয় নয়। উত্তর পাওয়া আর সঠিক প্রশ্ন করতে পারা এক বিষয় নয়।
আজকের পৃথিবীতে তাই ‘বীক্ষণ’-এর মতো পরিসরের প্রয়োজন আরও বেশি। এখানে মানুষ শেখে— কীভাবে শুনতে হয়; কীভাবে ভিন্নমতকে জায়গা দিতে হয়; কীভাবে নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে হয়; কীভাবে যুক্তি ও আবেগের পার্থক্য করতে হয়; কীভাবে ইতিহাসের আলোয় বর্তমানকে দেখতে হয়; কীভাবে সাহিত্যকে জীবন থেকে আলাদা না করে পড়তে জানতে হয়; আর সবচেয়ে বড় কথা—কীভাবে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হয়।
ভবিষ্যতের বীক্ষণ
৪৩ বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে তাই শুধু অতীতের গৌরবগাথা বললে হয় না। আগামীবদিনের বীক্ষণকে পৃথিবীর নতুন প্রশ্ন গ্রহণ করতে হবে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিন্তার ওপর কী প্রভাব ফেলবে; জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জীবন ও রাষ্ট্রকে কোথায় নিয়ে যাবে?, প্রযুক্তি কি মানুষকে স্বাধীন করবে, নাকি আরও নিয়ন্ত্রিত করবে?,
গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ কী; সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য কীভাবে নির্ধারিত হবে; অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর পথ কী; কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা কি নতুনভাবে ভাবতে হবে?, মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ভারসাম্য কোথায়?, সাহিত্য কি প্রযুক্তির যুগেও মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে থাকবে? —এসব প্রশ্ন আগামী দিনের ‘বীক্ষণ’ প্রসঙ্গ হতে পারে। কারণ বীক্ষণের প্রকৃতি থেমে যাওয়া নয়; তার প্রকৃতি অনুসন্ধানী।
ঐতিহ্যে ও কর্মে বৃহৎ-বিস্তৃত এক 'বীক্ষণ'
‘বীক্ষণ’ আজ ময়মনসিংহের সম্পদ। কিন্তু তার গুরুত্ব ময়মনসিংহের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়।একটি সাপ্তাহিক পাঠচক্র যখন চার দশকের বেশি সময় ধরে কোনো বিরতি ছাড়াই চলতে পারে, তা শুধু স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে বা দৃষ্টি ভঙ্গিতে বিবেচনা সঙ্গত নয়। যা বাংলাদেশের বিকেন্দ্রীভূত সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক দলিল। কোন কেন্দ্র বা ঢাকার বাইরে জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধিচর্চার নিজস্ব, অসাধারণ পরিসর তৈরি করা যায়—‘বীক্ষণ’ তার অনন্য উদাহরণ।একটি শহর বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে যেমন পরিচিত হয়, তেমনি পরিচিত হয় তার সৃজন ও মননশীল আলোকিত পরিমণ্ডলের সংস্কৃতির মাধ্যমে। ময়মনসিংহের সে-ই সংস্কৃতির অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী নাম ‘বীক্ষণ’।
শেষ অধ্যায়: বীক্ষণ একটি ক্রিয়া
৪৩ বছর শেষে ‘বীক্ষণ’-কে যদি একটি বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে সেটি হবে—বহমান; কারণ বীক্ষণ কোনো সমাপ্ত প্রকল্পের নাম নয়।এটি একটি ক্রিয়া, দেখার ক্রিয়া, ভাবার ক্রিয়া,প্রশ্ন করার ক্রিয়া, শেখার ক্রিয়া, নিজেকে সংশোধন করার ক্রিয়া কিংবা সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াবার ক্রিয়া। তাই বীক্ষণের বয়স ৪৩ বছর হলেও তার চিন্তার বয়স প্রতিটি নতুন প্রশ্নের সমান একদিনের বা কোন এক মুহুর্তের। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ তার ৪৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। ৪৪তম বছরে পা রেখেছে একটি পাঠচক্র, যার শুরু হয়েছিল ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব চত্বরে; যার পথ এসে পৌঁছেছে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে, মুক্তমঞ্চে, নানা প্রজন্মের কবি-লেখকের আড্ডায়, কখনো দেশের নানা প্রান্তে নিয়মিত আসরের অংশ হিসেবে বা 'কবিতার কর্মশালা' নামে, করোনাকাল থেকে 'বীক্ষণ' ভুবনগাঁও-য়ে, ভার্চ্যুয়াল পৃথিবীতে।
ময়মনসিংহের মাটিতে ৪৩ বছর ধরে উচ্চারিত নাম—বীক্ষণ।
কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে। কত বিষয় আলোচিত হয়েছে, কত মতের জন্ম হয়েছে, কত মতের সঙ্গে মতের সংঘাত হয়েছে। কিন্তু মূল স্রোত রয়ে গেছে।জানতে হবে, ভাবতে হবে, বলতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে—এই বোধের সমষ্টিই হয়তো বীক্ষণের প্রকৃত দর্শন।সক্রেটিসের মতো প্রশ্ন, প্লেটোর মতো জ্ঞানানুসন্ধান, অ্যারিস্টটলের মতো পর্যবেক্ষণ—এসবের সঙ্গে আধুনিক বাংলাদেশের মাটির অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে যে অনানুষ্ঠানিক পাঠশালা তৈরি হয়েছে, তার নাম বীক্ষণ।
এখানে কোনো ঘণ্টা বাজে না। এখানে কোন শিক্ষক নেই। এখানে ক্লাসের কোন শেষ নেই, এখানে কোনো সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। তবু প্রতি শুক্রবার একটি আড্ডার পাঠশালা বসে।সকাল থেকে দুপুর, কখনো বিরতির পর চলতে থাকে অনানুষ্ঠানিক আরও দীর্ঘ আড্ডা। চলতে থাকে চিন্তার বিনিময়।৪৩ বছর পূর্তিতে ‘বীক্ষণ’কে অভিনন্দন জানানো মানে শুধু অতীতকে অভিনন্দন জানানো নয়; ভবিষ্যতের প্রতিও আস্থার ঘোষণা।
পৃথিবী যতদিন প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে,এমন বীক্ষণ'র প্রয়োজনও ততদিন থাকবে। কেউ যতদিন সত্য খুঁজবে, এমন 'বীক্ষণ' ততদিন চলবে, আর যতদিন কোনো শুক্রবার সকালে কেউ কোন চিন্তা পোষে বা সৃজন ভাবনায় তাড়িত হয়ে অন্যজনের মুখোমুখি হবে, ততদিন দরোজাহীন আলোর এই পাঠশালা যেমন আছে তেমনি উন্মুক্তই থেকে যাবে।
তথ্যসূত্রঃ
দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক মুক্ত কণ্ঠ-এর সাহিত্য পাতা 'খোলা জানালা', চ্যানেল আই অনলাইন, ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, দৈনিক জনতা, দৈনিক মাটি ও মানুষ, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা,ভাঁজপত্র এবং প্রায় সাড়ে তিন দশক সংঠনের সাথে লেখকের সম্পৃক্ততা।

আপনার মতামত লিখুন :