ময়মনসিংহের মাটি থেকে একাত্তরের অমর আলো
স্বাধীন চৌধুরী কবি,প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
কোনো কোনো মানুষের জীবন একটি দীর্ঘ আলোকরেখা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সেই রেখা কখনো মাটির ওপর দিয়ে, কখনো জ্ঞানের ভুবন পেরিয়ে, কখনো ইতিহাসের অন্ধকারের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যায়। অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জীবন তেমনই এক আলোকরেখা—যার শুরু ময়মনসিংহে, পারিবারিক শিকড় বরিশালের বানারীপাড়ায়, বিকাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এবং যার চূড়ান্ত দীপ্তি ১৯৭১-এর রক্তাক্ত মার্চে।
তিনি শুধু একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী নন। তিনি ছিলেন শিক্ষক, সাহিত্যচিন্তক, মানবতাবাদী এবং মুক্তবুদ্ধির এক নিষ্ঠাবান সাধক। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে স্মরণ করা মানে একই সঙ্গে শিক্ষা, মানবিকতা, কর্তব্য ও আত্মত্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ করা।
ময়মনসিংহে জন্ম, বানারীপাড়ায় পৈতৃক শিকড়।
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জন্ম ১০ জুলাই ১৯২০ সালে ময়মনসিংহ শহরে। তাঁর বাবা কুমুদচন্দ্র গুহঠাকুরতা ছিলেন বরিশালের বানারীপাড়ার মানুষ এবং তাঁর মা সুমতীও ছিলেন শিক্ষিত পরিবার থেকে আসা। বাবা-মা দুজনই স্কুলশিক্ষক ছিলেন। ফলে জন্মপরিবারেই শিক্ষা তাঁর জীবনের প্রথম মূল্যবোধ হয়ে ওঠে।
তাঁর পরিচয় তাই একক কোনো ভূগোলে সীমাবদ্ধ নয়। জন্ম ও শৈশবের শহর ময়মনসিংহ; পৈতৃক শিকড় বরিশালের বানারীপাড়ায়। তাঁর পরবর্তী জীবন অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হলেও ময়মনসিংহ তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিভূমি।
১৯৩৬ সালে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে এক বছর পড়াশোনা করেন। টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ায় সেখানে চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে ফিরে আসেন ময়মনসিংহে এবং ভর্তি হন আনন্দমোহন কলেজে। ১৯৩৯ সালে তিনি সেখান থেকে আইএ পাস করেন। এই পর্বটি তাঁর জীবনের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যে মানুষটি পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ এবং পরে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বুদ্ধিজীবী, তাঁর মননশীলতার প্রথম পর্ব গড়ে উঠেছিল ময়মনসিংহের শিক্ষাঙ্গনেই।
জ্ঞানের পথে দ্রুত উত্থান
১৯৩৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪২ সালে ইংরেজিতে অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। অসাধারণ ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন 'পোপ মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল'। পরের বছর ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করেন।
১৯৪৪ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন—ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজ তাঁর শিক্ষকজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর কাছে শ্রেণিকক্ষ ছিল শুধু পাঠদানের জায়গা নয়; ছিল চিন্তা তৈরির ক্ষেত্র। সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক নন্দনতত্ত্ব ছিল না—সাহিত্য মানুষকে মানুষকে চিনতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, নিজের সময়কে বুঝতে শেখায়—এই বোধ তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল।
সাহিত্য থেকে মানবতাবাদ
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ ছিল উদার, অনুসন্ধিৎসু ও মানবতাবাদী। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেন এবং ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের বৃত্তিতে লন্ডনের কিংস কলেজে যান। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে ধ্রুপদি পুরাণের ব্যবহার। ১৯৬৭ সালে দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে রিডার হিসেবে দায়িত্ব নেন।
কিন্তু তাঁর মনন শুধু সাহিত্যতত্ত্বে আটকে থাকেনি। তিনি মুক্তবুদ্ধি ও মানবতাবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সময়ের পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মানুষের মর্যাদা ও যুক্তিবোধের পক্ষে।
এক প্রতিবেদনে তাঁর তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে বলা হয় 'পাকিস্তান সরকার তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখত; হিন্দু পরিবারে জন্ম এবং বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর ওপর নজরদারি ও বিধিনিষেধও ছিল।'
অর্থাৎ ১৯৭১-এ তাঁর ওপর নেমে আসা সহিংসতা হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তাঁর জীবন ও চিন্তার অবস্থানই তাঁকে পাকিস্তানি সামরিক রাষ্ট্রের কাছে একজন অস্বস্তিকর বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছিল।
জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ
১৯৭০ সালের ২০ এপ্রিল জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ হন। দায়িত্বটি তিনি গ্রহণ করেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল।
১৯৭১-এর মার্চে ঢাকা ছিল বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা এক নগরী। অসহযোগ আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে মানুষ বুঝতে পারছিল, সামনে ভয়াবহ কিছু আসছে।
তাঁকে অনেকে নিরাপদে চলে যেতে বলেছিলেন। তিনি ছাত্রদেরও নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের দায়িত্বের জায়গা ছেড়ে তিনি চলে যাননি। কিন্তু ছাত্রদের ফেলে তিনি চলে যেতে চাননি।
এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীকালে তাঁর জীবনকে ইতিহাসের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে যুক্ত করে।
২৫ মার্চ: যখন রাত নেমে এল হত্যার অন্ধকারে
২৫ মার্চ ১৯৭১। রাতের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করে অপারেশন সার্চলাইট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয় তাদের অন্যতম প্রধান হত্যাক্ষেত্রে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টারের ৩৪/এ নম্বর ভবনেও পৌঁছে যায় পাকিস্তানি সেনারা। সেখান থেকে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবং পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মুনীরুজ্জামানকে বের করে আনা হয়। তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়। মুনীরুজ্জামান ঘটনাস্থলেই নিহত হন; জ্যোতির্ময় গুরুতর আহত হন।
জ্যোতির্ময়ের শরীরে গুলি লাগে মেরুদণ্ডে। বাইরে তখন গোলাগুলি, কারফিউ, আতঙ্ক ও মৃত্যুর ছায়া। সেই অবস্থায় তাঁর স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতা, তাঁদের স্কুলপড়ুয়া কন্যা মেঘনা এবং গৃহকর্মী স্বর্ণা তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের ভেতরে নিয়ে আসেন। সারারাত ও পরের দিন তাঁরা তাঁর সেবা করেন।
২৭ মার্চ ভোরে কারফিউ কিছুটা শিথিল হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোর ঢাকা তখন কার্যত এক অবরুদ্ধ নগরী। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়নি। তৎকালীন চিকিৎসক অধ্যাপক মতিউর রহমানের স্মৃতিচারণায় জানা যায়, মেরুদণ্ডে গুলির কারণে জ্যোতির্ময় তখন প্যারাপ্লেজিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।
৩০ মার্চঃ এক জীবনের অবসান
৩০ মার্চ ১৯৭১, সকাল সাড়ে ৯টা ৩০ মিনিট। ঢাকা মেডিকেল কলেজের নথিতে এ সময়টিই জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃত্যুর সময় হিসেবে পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের ডেথ রেজিস্টারে তাঁর নাম পাওয়া যায়। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা এখানেই শেষ হয়নি। তাঁর পরিবার তাঁর মরদেহ হাতে পায়নি।
একজন শহীদ অধ্যাপকের মৃত্যু তাঁর পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছিল আরও এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার শুরু।জ্যোতির্ময়ের মরদেহ কোথায় গেল, কোথায় তাঁর শেষকৃত্য হলো—পরিবার তা আর জানতে পারেনি। মৃত্যুর পরও তাঁর অস্তিত্ব যেন রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অন্ধকারে হারিয়ে গেল।একজন মানুষকে হত্যা করা হলো। তারপর তাঁর মৃত্যুর প্রমাণটুকুও পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেল।
বাসন্তীঃ শহীদের স্ত্রী, একাত্তরের আরেক যোদ্ধা
জ্যোতির্ময়ের আত্মদানের কাহিনি তাঁর স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। স্বামীকে হারানোর পর বাসন্তীকে কন্যা মেঘনাকে নিয়ে শুরু করতে হয় আরেক যুদ্ধ—বেঁচে থাকার যুদ্ধ। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় ফিরে যেতে পারেননি। কখনো পরিচয় গোপন করে, কখনো শুভানুধ্যায়ীদের বাড়িতে, কখনো হাসপাতালের আশ্রয়ে তাঁকে কাটাতে হয়েছে যুদ্ধের দিনগুলো।এই সময় তাঁর কাছে স্বামীর স্মৃতি ছিল শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়—ছিল একমাত্র অবলম্বন।
তাঁদের একমাত্র সন্তান মেঘনা গুহঠাকুরতা পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। একটি পরিবারে পিতার অসমাপ্ত জীবন যেন কন্যার জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে নতুন অর্থ পায়।
বাসন্তী গুহঠাকুরতাও ছিলেন নিজস্ব পরিচয়ে একজন শিক্ষাবিদ। তাঁর জীবনের বড় অংশ নারীশিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত ছিল। জ্যোতির্ময়ের মৃত্যুর পর তাঁর সংগ্রামকে তাই কেবল ‘শহীদের স্ত্রী’র বেদনা দিয়ে মাপা যাবে না; তিনি ছিলেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের মানুষ।
মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মৃত্যুর সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের নথিতে তাঁর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও পরিবার তাঁর মরদেহ পায়নি। এমনকি যুদ্ধের পরিস্থিতিতে যথাযথ মৃত্যুসনদ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। পরে তাঁর পরিবারকে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা পেতেও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো নথি ঘেঁটে আরও উঠে এসেছে, জ্যোতির্ময়ের বিদেশে পিএইচডি করতে যাওয়ার সময় নেওয়া শিক্ষাঋণ, জীবনবিমা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাওনা নিয়ে যুদ্ধকালেই তাঁর পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ চিঠিপত্র চলেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালের ১২ আগস্ট অর্থ ছাড়ের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই ঘটনাগুলো ইতিহাসের একটি নির্মম সত্যকে সামনে আনে—একজন শহীদের পরিবার কখনো কখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যুদ্ধের ভেতরেই থাকে।
জ্যোতির্ময় কেন আজও প্রাসঙ্গিক
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জীবনকে শুধু ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ অভিধায় আবদ্ধ করলে তাঁর গভীরতর তাৎপর্য হারিয়ে যায়। তিনি এমন একজন শিক্ষক ছিলেন, যাঁর কাছে জ্ঞান মানে ছিল মুক্তি।এমন এক সাহিত্যিক চিন্তক, যাঁর কাছে সংস্কৃতি মানে ছিল মানুষের মুক্ত বিকাশ। এমন একজন মানবতাবাদী, যাঁর কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয় বড়। এমন একজন প্রাধ্যক্ষ, যিনি বিপদের সময় ছাত্রদের ছেড়ে নিজের নিরাপত্তা বেছে নেননি।
তাঁর আত্মদান নিছক কোন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়। এ এক কর্তব্যের সামনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অতিক্রম করার বিরল নৈতিক সিদ্ধান্ত।
ময়মনসিংহের সন্তান বাংলাদেশের হয়ে শহীদ হলেন
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জীবনকে ময়মনসিংহের ইতিহাসের সঙ্গেও নতুন করে পাঠ করা প্রয়োজন।এ শহরেই তাঁর জন্ম। এ শহরের জিলা স্কুলে তাঁর কৈশোরের শিক্ষা। এ শহরের আনন্দমোহন কলেজে তাঁর উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ শহরের শিক্ষাঙ্গনেই তিনি শিক্ষকতা করেছেন।তারপর তিনি ছড়িয়ে পড়েছেন বৃহত্তর বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, লন্ডনের কিংস কলেজে, সাহিত্য ও মানবতাবাদী চিন্তার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
তাঁর পৈতৃক শিকড় বরিশালের বানারীপাড়ায় হলেও ময়মনসিংহ তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠার শহর—এই পরিচয়টি তাঁর জীবনীতে বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। তাই তাঁকে বলা যায়—ময়মনসিংহের সন্তান, বানারীপাড়ার শিকড় থেকে উঠে আসা বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী।
শেষ আলো
একাত্তরের ২৫ মার্চের রাত ছিল অন্ধকারের রাত। সেই অন্ধকারে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু হত্যাকারীরা বুঝতে পারেনি—মানুষকে হত্যা করা যায়, মানুষের চিন্তাকে নয়।
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। তাঁর জীবন থেমে গিয়েছিল ৩০ মার্চ। তাঁর পরিবার তাঁর মরদেহও পায়নি। কিন্তু তাঁর যে বিশ্বাস—মানুষের প্রতি আস্থা, মুক্তবুদ্ধির প্রতি দায়, শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার এবং অন্যায়ের সামনে নৈতিক অবস্থান—তা রয়ে গেছে।আজ তাঁর জীবনের দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সেই সিদ্ধান্তটি—তিনি ছাত্রদের রেখে চলে যাননি। এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন তাঁর সমগ্র জীবনদর্শনের সারাংশ লুকিয়ে আছে। শিক্ষক তাঁর কাছে শুধু পাঠদানকারী ছিলেন না; শিক্ষক ছিলেন আশ্রয়। প্রাধ্যক্ষ শুধু প্রশাসনিক পদ ছিল না; ছিল মানুষের প্রতি দায়িত্ব।
দেশ শুধু ভূখণ্ড ছিল না; ছিল নৈতিকবোধের অঙ্গীকার।
ময়মনসিংহের মাটি থেকে উঠে আসা সেই শিক্ষক নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন— আলো কখনো শুধু আলোকিত করে না; কখনো কখনো আলো হয়ে উঠতে হয়। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা সেই আলো হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু শেষ কথা নয়। তাঁর আত্মদান তাঁর মহত্তম দীর্ঘ জীবন।যে আলোকে ২৫ মার্চের রাত নিভিয়ে দিতে পারেনি, বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই আলো আজও জ্বলে আছে।
তথ্যসূত্র:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হলের ইতিহাস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগ—BA (Honours) Handbook, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় Alumni/Academic Handbook, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদ বুদ্ধিজীবী বিষয়ক প্রকাশনা, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা স্মারকগ্রন্থ।

আপনার মতামত লিখুন :