শিউলী রেখা, বিশেষ প্রতিনিধি : সত্য প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্মম হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাঁচ সাংবাদিক। তাঁদের কেউ দুর্বৃত্তের গুলিতে, কেউ ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার কেউ দীর্ঘদিন নির্যাতনের ক্ষত ও শারীরিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এসব ঘটনার পেছনে সংবাদ প্রকাশ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
একটির পর একটি হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার অভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। অন্যদিকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির: বালুঘাটের অনিয়ম তুলে ধরায় গুলি করে হত্যা:নেত্রকোনার দুর্গাপুরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত ছিলেন লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি রূপসী বাংলা চ্যানেলের প্রতিনিধি এবং অনুসন্ধানী ফেসবুকে পেজ ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’-এর পরিচালক ছিলেন।সোমেশ্বরী নদীর বালুঘাট, অবৈধ বালু উত্তোলন ও স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম তুলে ধরার কারণেই প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়েন আলিফ। গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুরের তেলনজিয়া বাজারে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সহকর্মীরা।
আসাদুজ্জামান তুহিন: পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা: দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিনকে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই এলাকায় এক ব্যক্তিকে মারধরের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন তুহিন। এ সময় দুর্বৃত্তরা তাঁকে ভিডিও মুছে ফেলতে চাপ দেয়। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পরও তিনি ভিডিও মুছতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সংবাদকর্মীকে এভাবে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। সহকর্মীদের দাবি, তুহিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গোলাম রব্বানী নাদিম: দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের জেরে প্রাণ হারান: জামালপুরের সাহসী সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম ছিলেন বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জেলা প্রতিনিধি। স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জেরে তিনি হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের ১৪ জুন রাতে দুর্বৃত্তরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নাদিম হত্যাকাণ্ড সাংবাদিক সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণে একজন সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হওয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়।
স্বপন কুমার ভদ্র: মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে লেখালেখির জেরে হত্যার অভিযোগ: ময়মনসিংহের সাংবাদিক স্বপন কুমার ভদ্র স্থানীয় মাদক ব্যবসা, চোরাচালান ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। বিশেষ করে শম্ভুগঞ্জ ও রঘুরামপুর এলাকার মাদক ও চোরাচালানসংক্রান্ত অনিয়ম তুলে ধরার কারণে তিনি একটি মহলের বিরাগভাজন হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সহকর্মীদের অভিযোগ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণেই তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার শিকার হতে হয়েছে।
শেলু আকন্দ: নির্যাতনের ক্ষত বয়ে পাঁচ বছর পর মৃত্যু: জামালপুরের সাংবাদিক শেলু আকন্দ ছিলেন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি এবং জামালপুর পল্লীকণ্ঠ প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার। ভূমিদস্যুতা, দুর্নীতি ও স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এসব সংবাদ প্রকাশের জেরে ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে তাঁর ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা তাঁর দুই পা ভেঙে দেয়। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি পঙ্গুত্ব ও শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে জীবনযাপন করেন। অবশেষে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। সহকর্মী ও পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা তাঁর মৃত্যুর অন্যতম কারণ। তাঁরা এই নির্যাতনের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
পাঁচ সাংবাদিকের ঘটনায় বিচার ও নিরাপত্তার দাবি: ময়মনসিংহ অঞ্চলে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতাদের মতে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সত্য প্রকাশ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে। তাঁরা বলেন, সাংবাদিক তুহিন, আলিফ, নাদিম ও স্বপন ভদ্রের হত্যাকাণ্ড এবং শেলু আকন্দের ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরা কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এসব ঘটনায় কার্যকর বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোঃ খায়রুল আলম রফিক এসব ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা এই পাঁচ সাংবাদিকের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। প্রয়োজনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাগুলো নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। সাংবাদিকদের হত্যা করে, নির্যাতন চালিয়ে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে সত্য প্রকাশ বন্ধ করা যাবে না।তিনি আরও বলেন, ‘একজন সাংবাদিককে হত্যা করা মানে শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ধ্বংস করা নয়, সমাজের সত্য জানার অধিকারকেও আঘাত করা। তুহিন, আলিফ, নাদিম, স্বপন ভদ্র ও শেলু আকন্দের পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়, সে জন্য আমরা সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাব।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা প্রদান, প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা এবং বিচার দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে সাংবাদিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণাও দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
শোকের ভারে পরিবার, নিরাপত্তাহীনতায় সাংবাদিক সমাজ: পাঁচ সাংবাদিকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের শোকের পাশাপাশি সহকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। সংবাদ সংগ্রহ, দুর্নীতি অনুসন্ধান কিংবা অপরাধের তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে কখন যে হামলার শিকার হতে হবে, সেই আশঙ্কা এখন অনেক সংবাদকর্মীর নিত্যসঙ্গী। সাংবাদিক সমাজের দাবি, প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে সত্য প্রকাশের পথ ক্রমেই সংকুচিত হবে।
পাঁচ সাংবাদিকের পরিবার আজও ন্যায়বিচার ও স্বজন হারানোর ক্ষতিপূরণের প্রত্যাশায়। তাঁদের প্রশ্ন—সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে আর কত সাংবাদিককে জীবন দিতে হবে? আর কত পরিবারকে বিচারের অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটাতে হবে?

আপনার মতামত লিখুন :