চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে। তবে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আগের সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বহাল থাকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেউ কেউ অবস্থান ও রাজনৈতিক পরিচয়ের খোলস বদলে নতুন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল বা পদায়ন নিচ্ছেন। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও বিভিন্ন মহল থেকে উঠছে। সম্প্রতি এক পুলিশ কর্মকর্তার কথিত অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ প্রশাসনে বদলি-পদায়ন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কথিত আর্থিক লেনদেন নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে।
কথিত অডিও ঘিরে তোলপাড়: ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। অডিওতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ, পুলিশের সক্ষমতা, পুলিশ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেন নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য শোনা যায় বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হয়। পুলিশ প্রশাসনের আদেশ অনুযায়ী, ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে প্রশাসনিক কারণে সদরদপ্তর ও পুলিশ প্রশাসন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে ভাইরাল হওয়া অডিওটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাকিবুল হাসান নিজেই। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। গণমাধ্যমকে যাচাই-বাছাই ছাড়া সেটি প্রচার না করার আহ্বানও জানান তিনি।
সাভার মডেল থানার ওসি নিয়েও প্রশ্ন: এদিকে ঢাকা জেলার সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলমের পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে তাকে সাভার মডেল থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়।
এ পদায়নের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে ডিবিতে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তার পদায়ন ও তাদের পারিবারিক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তারপরও তাদের বহাল রেখেছে ঢাকা জেলা পুলিশ।
‘হারুনের ক্যাশিয়ার’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুরুতর অভিযোগ : পুলিশ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ওরফে জুয়েলকে ঘিরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ ছড়িয়েছে।এনসিপি-সমর্থিত ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সংগঠন ন্যাশনাল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. শেখ জামাল (আবির) একটি পত্রিকার কাটিং শেয়ার করে মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন।
পোস্টে তাকে ‘হারুনের ক্যাশিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করা হয়, তিনি সাবেক ডিআইজি হারুন অর রশিদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। আরও দাবি করা হয়, ৫ আগস্টের পর তাকে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে বদলি করা হলেও পরবর্তীতে ঢাকায় এসবিতে পদায়ন করা হয় এবং এ পদায়নের পেছনে রাজনৈতিক তদবির ছিল।পোস্টে তার বিরুদ্ধে অতীতে দায়িত্ব পালনকালে অভিযান, নিয়োগ, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগও আনা হয়েছে।
মো. আব্দুস সালাম নামে এক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের ফেসবুক পোস্টেও পুলিশে বদলি-পদায়ন/বদলি নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। তিনি দাবি করেন, বিএনপি পরিবারের একজন ওসিকে ঢাকা রেঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ রেঞ্জে বদলি করা হলেও সাবেক ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া তাকে যোগদান করতে দেয়নি।
সেই পুলিশ পরিদর্শক এক সময়ে ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। তার ওসি হওয়ার স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি। তার পরিবারের একজন সদস্য দীর্ঘদিন বিএনপির দায়িত্বশীল পদে থাকলেও ময়মনসিংহের গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়ন পাননি বলেও পোস্টে দাবি করা হয়। এ ক্ষেত্রে একাধিক মন্ত্রীর সুপারিশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাঁশখালীর ওসিকে ঘিরেও পুরোনো ঘটনা সামনে: চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার ওসি রবিউল হককে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো একটি ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।ফাহাদ মোহাম্মদ নামে এক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ২০১৮ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থানায় দায়িত্ব পালনকালে রবিউল হক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদকে ঈদের নামাজে যেতে তার বাড়ির দরজায় বাধা দিয়েছিলেন। পোস্টে ওই সময়ের বক্তব্যের ভিডিও থাকার কথাও বলা হয়েছে। তবে ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি এবং ওই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই না করে অভিযোগটির সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ময়মনসিংহ রেঞ্জের ২৩ থানায় নজর: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ময়মনসিংহ রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় ওসি পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তাকে নতুন করে বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যেই ময়মনসিংহ সদর, গৌরীপুর, নান্দাইল, ফুলপুর ও গফরগাঁওসহ কয়েকটি এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কথিত ঝটিকা কর্মসূচি, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, এসব কর্মসূচির খবর অনেক সময় আগেই ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও অভিযানের আগেই সংশ্লিষ্টরা পুলিশের তৎপরতার খবর পেয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫৬টি মানববন্ধন ও কর্মসূচি পালনের তথ্য পাওয়া গেছে।
থানার আশপাশে ‘তথ্যদাতা’ কারা? ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার আশপাশে কথিত সোর্স নেটওয়ার্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতরা পেশা পরিবর্তন করে সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীর পরিচয় ব্যবহার করছেন এবং পুলিশের বিভিন্ন অভিযানের তথ্য আগে থেকেই সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, থানার সামনে ও আশপাশে থাকা এসব কথিত সোর্সের মাধ্যমে পুলিশি অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা তৎপরতার তথ্য ফাঁস হচ্ছে।
বদলি-পদায়নে স্বচ্ছতার প্রশ্ন: পুলিশে বদলি ও পদায়ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রত্যাশার মধ্যে একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করা ওসিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগও উঠছে। ফলে কোনো কর্মকর্তা কোন সময়ে কোথায় দায়িত্ব পালন করেছেন, তার বদলি-পদায়নের আদেশ কীভাবে হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় বা ফৌজদারি অভিযোগের তদন্ত হয়েছে কি না—এসব তথ্য নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন :