দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে পুলিশ। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, খুন-ছিনতাই-ডাকাতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধের পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতিও নিতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের অভ্যন্তরীণ বদলি, পদায়ন, অবসর ও অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলার তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তার, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলাও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্বের তালিকায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে মাঠপুলিশের ওপর জবাবদিহির চাপ আরও বেড়েছে। এরই মধ্যে ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পুলিশ জানায়, মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গেলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। পরে ওই ঘটনায় মামলা হয়।
ঘটনার পাঁচ দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদ এবং গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তবে ডিএমপির আদেশে তাদের প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক রাজনৈতিক জমায়েত ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির মাসিক অপরাধ সভাতেও সংশ্লিষ্ট এলাকার ওসি ও ডিসিদের দায়বদ্ধতার বিষয়ে সতর্ক করা হয় বলে গণমাধ্যমে এসেছে।
ময়মনসিংহেও বাড়ছে উদ্বেগ
রাজধানীর পাশাপাশি ময়মনসিংহ নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নগরীর মাসকান্দা এলাকায় সৌখিন বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিছিল-মিটিং এবং এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর নানা ধরনের চাপের অভিযোগও উঠছে।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানাকে ঘিরে রাজনৈতিক তদবিরের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নেওয়া কিংবা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। কোতোয়ালি থানার সামনে থানা ঘাড়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে থেকে তদবির করে। আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের কাছে তথ্য প্রচার করে। তাদের মোবাইলের হোয়াটসঅ্যাপ যাচাই করা হোক।
অন্যদিকে, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও মাঠপর্যায়ে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে পুলিশ সদস্যদের ওপর ৩১৭টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিও পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫৭টি উদ্ধার হলেও এখনো ১ হাজার ৩০৬টি অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্র অপরাধে ব্যবহৃত হতে পারে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় নির্বাচনী সহিংসতায় এসব অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাও আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। অবশিষ্ট অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সমন্বয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ চাপও কম নয়
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা ধরনের চাপ রয়েছে। বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও অবসরকে কেন্দ্র করে বাহিনীর মধ্যে অনিশ্চয়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটেও ২০২৬ সালে অবসরসংক্রান্ত একাধিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর বাইরে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, অনলাইন জুয়া, উগ্রবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা বলেন, যেকোনো ধরনের চাপ নিয়ে কাজ করতে পুলিশ অভ্যস্ত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড় কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর গোয়েন্দা ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে আসার পরিবর্তে আগাম তথ্য সংগ্রহ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশে চলমান প্রশাসনিক ও জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় যাতে নিরীহ কর্মকর্তা বা সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, পুলিশের নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা—একসঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে কাজ করতে হচ্ছে মাঠপুলিশকে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের সক্ষমতা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কার্যকর সমন্বয়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন :