চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রেন অপারেটর থেকে শত কোটি টাকার মালিক হুমায়ুন– নাসির সিন্ডিকেট

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:১৮ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রেন অপারেটর থেকে শত কোটি টাকার মালিক হুমায়ুন– নাসির সিন্ডিকেট

ফাইল ফটো

চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রেন অপারেটর হিসেবে কর্মরত হুমায়ুন কবিরকে ঘিরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান ও চট্টগ্রামের সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রভাববলয় গড়ে তোলেন হুমায়ুন। পরে দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর উইন্সম্যান বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি হন। তার ঘনিষ্ঠ সহচর নাসির উল্লাহ ওই সমিতির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সমিতির পদ ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে গত কয়েক বছরে বন্দরে নিয়োগ ও কাজ বণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হয়েছে। বিশেষ করে বন্দরের কার্গো, আউটার ও কনটেইনার— এই তিন বার্থে বৈধ কার্ডধারী ক্রেন অপারেটরদের বাদ দিয়ে হুমায়ুন-নাসিরের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ক্রেন অপারেটর হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এর বিনিময়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের নিয়োগের কারণে বৈধ কার্ডধারী অনেক ক্রেন অপারেটর কাজ ও আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, দিনের পর দিন কাজ না থাকায় বেতন ও জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।

হুমায়ুন-নাসিরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে একাধিকবার বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার কারণেই অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।

ক্রেন অপারেটরের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

হুমায়ুন কবিরের সম্পদ নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অনুসন্ধানকালে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, বন্দরের একজন ক্রেন অপারেটর হিসেবে চাকরি করলেও হুমায়ুনের নামে বা তার পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে একাধিক মূল্যবান সম্পদ।

সূত্রের দাবি, হুমায়ুনের রয়েছে পাঁচটি বিলাসবহুল ফিল্ডার গাড়ি। তার স্ত্রীর নামে চট্টগ্রামের বড়পুল এলাকায় একটি বড় ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ও কুমিল্লায় জায়গা-সম্পত্তি এবং সন্দ্বীপে পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের ওপর নির্মিত একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

তার ঘনিষ্ঠ সহচর নাসির উল্লাহরও রয়েছে একাধিক গাড়ি ও বাড়িসহ সম্পদ। সূত্রের দাবি, তার তিনটি ফিল্ডার গাড়ি রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একজন সাধারণ ক্রেন অপারেটরের চাকরির আয় দিয়ে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

বেতন বনাম সম্পদ

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রেন অপারেটর পদে বর্তমানে দৈনিক বেতন ২ হাজার ৭৯৮ টাকা। এই হিসাবে দৈনিক বেতন ধরে ১৭ বছরের চাকরিজীবনে হুমায়ুনের মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ ২৩ হাজার ৭৬০ টাকা। তবে এই হিসাবের মধ্যে অতিরিক্ত ভাতা, বোনাস, অন্যান্য বৈধ আয় কিংবা কর-পরবর্তী হিসাব অন্তর্ভুক্ত নয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, হুমায়ুনের বর্তমান সম্পদের মূল্যই কয়েক কোটি টাকা। ফলে তার সম্পদের সঙ্গে ঘোষিত বা চাকরিজীবনের সম্ভাব্য আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

মামলা ও আন্দোলনে হামলার অভিযোগ

হুমায়ুন কবির ও নাসির উল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত ৪ আগস্ট শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে এসব মামলার অভিযোগের সত্যতা ও মামলাগুলোর বর্তমান আইনগত অবস্থান সংশ্লিষ্ট নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

সরকার পরিবর্তনের পরও প্রভাব কীভাবে বহাল?

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও হুমায়ুন-নাসিরসহ তাদের ঘনিষ্ঠদের চট্টগ্রাম বন্দরে প্রভাব কীভাবে বহাল রয়েছে—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তারা দলীয় অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্দরে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। একইভাবে মো. আবু ইউসুফ নামে আরও একজনের বিরুদ্ধেও দলীয় অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আগে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন; পরে বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।

তবে এসব রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

অভিযোগ অস্বীকার নাসিরের

হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে তার সহচর নাসির উল্লাহ অভিযোগগুলো এড়িয়ে যান। বিলাসবহুল গাড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পার্টনারশিপের গাড়ি সেগুলো।” রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বন্দরে কোনো ধরনের আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে, বর্তমানে বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আবু ইউসুফ অতীতে কিছু অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তবে বর্তমানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হবে না বলে তিনি দাবি করেন।

বন্দরের কথিত অবৈধ নিয়োগের বিষয়ে আবু ইউসুফ বলেন, “আমার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অবৈধদের বাতিল করে বৈধদের বহালের জন্যও আমি কাজ করছি।”

সিয়াম সরিষা
Link copied!