জৈন্তাপুর সীমান্তে চোরাচালানের নিরাপদ রুট, গোয়েন্দা তালিকায় ৮৬ জন

নিউজ ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:২০ এএম

জৈন্তাপুর সীমান্তে চোরাচালানের নিরাপদ রুট, গোয়েন্দা তালিকায় ৮৬ জন

ফাইল ফটো

সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সীমান্তের বিভিন্ন অংশে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় দিন-রাত অবাধে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে গরুসহ বিভিন্ন ধরনের চোরাইপণ্য। একই সঙ্গে মাদক, গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্রের চালান প্রবেশের অভিযোগও রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে মটরশুঁটি, মসুর ডাল, রসুন, স্বর্ণের বারসহ বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সুন্ধি কাছিম (কচ্ছপ)।

সীমান্তকেন্দ্রিক এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে,  থানা পুলিশের কতিপয় সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে একটি গোয়েন্দা সংস্থা জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই তালিকায় ৮৬ জনের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২১ জনকে ‘মোস্ট ওয়ানটেড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় চোরাচালানিদের পাশাপাশি বিজিবি, ডিবি ও থানা পুলিশের ওসিসহ ৫ জনের নাম তালিকায় আছে। সোর্স-লাইনম্যান, সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতাদের নামও রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর জৈন্তাপুরের হরিপুর বাজারে চোরাচালানের পণ্য উদ্ধারে অভিযান চালাতে গিয়ে র‌্যাব-৯-এর একটি দল হামলার শিকার হয়। এ সময় চোরাকারবারিদের হামলায় কয়েকজন র‌্যাব সদস্য আহত হন ।

ঘটনার পর একই রাতে চোরাকারবারিদের আটক ও চোরাইপণ্য উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব। ওই অভিযানে ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল কাহির পঁচা, ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় ৩০ জনকে আটক করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই ঘটনার পর চোরাচালান চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা অনুসন্ধান শুরু হয়। দীর্ঘ তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানাসহ একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে পাওয়া তালিকায় জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাট এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির নাম রয়েছে। তালিকায় বিজিবির সোর্স হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকায় রয়েছেন জৈন্তাপুরের কেন্দ্রী গ্রামের আহমদ আলীর ছেলে রুবেল আহমদ, একই গ্রামের তেরা মিয়ার ছেলে আহমদ আলী, আসামপাড়ার সৈয়দ আলীর ছেলে রাশিদ আলী, মাস্তিংহাটির আলতাফ মিয়ার ছেলে ইসলাম উদ্দিন, কদমখালের কালা মিয়ার ছেলে জসিম উদ্দিন, আলুবাগানের টেম্বল মিয়ার ছেলে রুবেল মিয়া, একই গ্রামের সৈয়দ জহিরের ছেলে সৈয়দ মাসুম, গৌরীশংকর এলাকার তফন মিয়ার ছেলে আব্দুল্লাহ, গোয়াইনঘাটের পাঁচ সেউতি গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে সুহেল আহমদ, কালিঞ্জিবাড়ীর মালিক, আলুবাগান (মোকামবাড়ি) এলাকার আং লতিফের ছেলে সৈয়দ রাজু, একই এলাকার সৈয়দ মিজান, আলুবাগানের ছন্দাই মেম্বারের বাড়ির লোকমান হোসেন চৌধুরী, হেমু গ্রামের আব্দুর রফিকের ছেলে হাজী মোহাম্মদ আলী ও তাঁর ভাই হোসেন আলী।

এ ছাড়া বালিপাড়ার সমছুল আলীর ছেলে নুরুল ইসলাম, কানাইঘাটের দুর্গাপুরের ইলিয়াছ আলীর ছেলে আলকাছ মিয়া, জৈন্তাপুরের কান্দিগ্রামের মতছির আলীর ছেলে রিয়াজ আহমদ, বালিপাড়ার নয়াখেল গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে শাহজাহান, একই এলাকার সফর আলীর ছেলে আলমগীর, কানাইঘাটের বড়বন্দ প্রথম খণ্ডের ইলিয়াস আলীর ছেলে শাহজাহান, বড়বন্দ চতুর্থ খণ্ডের আশিক, সিঙ্গারীপাড়ার আব্দুল হাসিমের ছেলে সাবেক ইউপি সদস্য নুর আহমদ, কান্দিগ্রামের রকিব আলীর ছেলে আব্দুল হাই, জৈন্তাপুরের ডিবির হাওর এলাকার মৃত মস্তকিনের ছেলে হারুন মিয়া, সুলেমান আহমদ (মৃত), আব্দুল হান্নান পটল, গৌরীশংকর গ্রামের প্রকাশ হাওলাদারের ছেলে নাজমুল ইসলাম মুন্নি, নিজপাট ইউনিয়নের ফুলবাড়ি ঘিলাতৈলের মৃত হাছন আলীর ছেলে মনসুর আহমদ ও তাঁর ভাই মনা আহমদের নাম রয়েছে।

তালিকায় আরও রয়েছেন একই এলাকার সামছুল ইসলাম, নিজপাট তেয়াসীহাটির আরিফ আহমদ, মাজিহাটির সিদ্দিক আহমদ, লামা শ্যামপুরের মুছা মিয়ার ছেলে জালাল উদ্দিন, নিশ্চিন্তপুরের নুর উদ্দিন মাস্টারের ছেলে সেলিম আহমদ, লাল জৈন্তাপুরের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে মো. জালাল উদ্দিন, ফতেপুর ইউনিয়নের সাবেক বহিষ্কৃত চেয়ারম্যান মো. রফিক আহমদ, হেমু ভাটিপাড়ার মো. ইয়াহইয়া, হেমু মাজরটুলের বিলাল, মানিকপাড়ার বিলাল আহমদ, ফতেপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিক আহমদ, হেমু গ্রামের হেলাল আহমদ, হরিপুরের আব্দুল মালিক ওরফে মালিক হাজীর ছেলে সুফিয়ার, হেলিরাই এলাকার আবুল হোসেন, কালিঞ্জিবাড়ীর মো. রহিম উদ্দিন, ডিবির হাওরের ফরিদ আহমদ ও গফুর মিয়া।

এ ছাড়া গৌরীশংকর গ্রামের লাল মিয়া ওরফে লালা ও তাঁর ছেলে পারভেজ, জৈন্তাপুরের পাখিবিল গ্রামের আলী আহমদ ও আবুল খয়ের, টিপরাখলা গ্রামের শাহীন আহমদ ও আমিন, গৌরীশংকর এলাকার ডালিম, কেন্দ্রী গ্রামের মো. আজাদ মিয়া, ৪ নম্বর বাংলাবাজারের বারেক, কেন্দ্রী গ্রামের বেলু ও জিতু, আসামপাড়ার মতিন, বিলাল ও কাশেম, গুচ্ছগ্রামের এরশাদ ও দিলিপ এবং লামাশ্যামপুরের স্বপন মোল্লা ওরফে সোবহান মোল্লার নামও রয়েছে।

গোয়েন্দা তালিকার পৃথক অংশে ২১ জনকে মোস্ট ওয়ানটেড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঘিলাতৈল গ্রামের আব্দুল করিম ওরফে ব্রান্ডিজ করিম, রুপক রায় ওরফে ঢাকাইয়া রুপক, হরিপুরের রফিক আহমদ ওরফে লোদাই হাজী, আলুবাগানের কবিরাজ ফারুক, কেন্দ্রী গ্রামের মিজান আহমদ রুবেল, আনোয়ার হোসেন, রাম কিশ্বাস, শ্রমিকনেতা সাইফুল ইসলাম, আলী আকবর, হেলাল উদ্দিন, ইমরান হোসেন, সোহেল আহমদ, ইউনুছ মিয়া, গুলজার মিয়া, আব্দুল করিম, আব্দুল্লাহ মিয়া, লালা মিয়া, পারভেজ মিয়া, নজরুল ইসলাম নজাই ও নাজিম মিয়াসহ আরও কয়েকজন।

সীমান্ত এলাকার একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, তালিকাভুক্ত ও অন্যান্য চোরাচালানিদের মাধ্যমে সীমান্তের নদী, পাহাড় ও বিভিন্ন অরক্ষিত পথ ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় নাছির বিড়ি, পাতার বিড়ি, টাটা গাড়ির যন্ত্রাংশ, টায়ার, মোটরসাইকেল, নিম্নমানের চা-পাতা, হরলিক্স, ওষুধ, প্রসাধনসামগ্রী, সুপারি, ইয়াবা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ও গরু।

অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে মটরশুঁটি, মসুর ডাল, রসুন, স্বর্ণের বারসহ বিভিন্ন পণ্য। এমনকি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সুন্ধি কাছিমও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দিনের বেলায় সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন বাড়ি ও জঙ্গলে শত শত গরু বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রাখা হয়। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো বিভিন্ন পথে দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জৈন্তাপুর উপজেলার চারিকাটা ইউনিয়নের সিঙ্গারীপাড়, বালিদাঁড়া, ইয়াংরাজা, আফিফা-নগর চা-বাগান, বাঘছড়া, তুমইর, জঙ্গীবিল ও লালাখাল চা-বাগান এলাকায় চোরাচালানের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া নিজপাট ইউনিয়নের কালিঞ্জিবাড়ী, জালিয়াখলা, হর্নি, বাইরাখেল, লালাখাল রিসোর্স সেন্টার এলাকা, নয়াগ্রাম, মাঝরবিল, গোয়াবাড়ী, টিপরাখলা, ফুলবাড়ী, মহিষমারা, কমলাবাড়ী, ঘিলাতৈল, খলারবন্দ, আতাউরের বাগান ও ডিবির হাওর এলাকায় বিভিন্ন পণ্য আনা-নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জৈন্তাপুর ইউনিয়নের কেন্দ্রী বিল, কেন্দ্রী হাওর, কাঁঠালবাড়ী, ঝিঙ্গাবাড়ী, মিনাটিলা, ছাগল খাউরী, আসামপাড়া, আদর্শগ্রাম, শ্রীপুর, মোকামপুঞ্জি, আলুবাগান ও নলজুরীসহ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টকে চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সীমান্তের এসব পয়েন্ট দিয়ে কীভাবে পণ্য প্রবেশ করছে, কারা এর নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। গোয়েন্দা তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

সিয়াম সরিষা
Link copied!