সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের নায়েক মো. সিদ্দিকুর রহমানের সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও একপর্যায়ে নিজেই সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয়ভাবে তাঁকে সীমান্তের চোরাচালান চক্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে।পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের বাড়ি সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকায়। চাকরির সুবাদে তিনি পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। গত পাঁচ বছর এসব এলাকায় কর্মরত থাকার সময় সিলেট অঞ্চলের সীমান্তকেন্দ্রিক বিভিন্ন অবৈধ বাণিজ্যে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মাদক, জিরা, প্রসাধনসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য বালুবাহী ট্রাকে করে দেশের অভ্যন্তরে আনা হয়। এসব পণ্য হবিগঞ্জ, ভৈরব হয়ে রাজধানীর চকবাজারসহ বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই অবৈধ পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যে প্রতি মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানকে ঘিরে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে। একটি গোপন সূত্রের দাবি, প্রায় এক মাস আগে দুবাই থেকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণের একটি চালান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে। অভিযোগ রয়েছে, দুবাইয়ে অবস্থানরত সিদ্দিকুর রহমানের তিন ভাইয়ের সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের মাধ্যমেই ওই চালান বাংলাদেশে পাঠানো হয় বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণের চালানটি সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানসহ তাঁর সহযোগী হিসেবে পরিচিত আরও কয়েকজনের চালানটি গ্রহণ করার কথা ছিল বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানের খবর পেয়ে চালানটি পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের সিন্ডিকেটের এক সদস্যের কাছে রেখে সংশ্লিষ্টরা সরে যান। পরে ওই সদস্য স্বর্ণের চালানটি আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকার দুটি চোরাচালান সিন্ডিকেটের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
তিন ব্যাংক হিসাবে পাঁচ কোটি টাকার লেনদেন: পুলিশের একজন নায়েকের আর্থিক লেনদেন নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হচ্ছে, গোয়েন্দা পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের তিনটি ব্যাংক হিসাবে গত দুই মাসে প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। শুধু নিজের ব্যাংক হিসাব নয়, তাঁর আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক হিসাবেও শতকোটি টাকার লেনদেন হয়। একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউপি সদস্য মুর্তজা আলীও এ চক্রের সদস্য। তবে মর্তুজা মেম্বার জানান, আমি খুব জনপ্রিয় হওয়ায় চোরাচালান চক্র আমার নাম বলে। পুলিশ সিদ্দিক গ্রহণ খুব ভালো ছেলে। আর ব্যাংকের সকল টাকা তার ভাইদের।
একজন পুলিশ সদস্যের চাকরির আয় ও দৃশ্যমান আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে এসব লেনদেনের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গোয়াইনঘাটের স্থানীয় বাসিন্দারা। এসব অর্থের উৎস, প্রকৃত সুবিধাভোগী এবং লেনদেনের সঙ্গে চোরাচালান চক্রের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠ মুর্তজা আলী মেম্বার আরও দাবি করেছেন, তাঁর ভাইয়েরা দুবাইয়ে ব্যবসা করেন। টাকাপয়সার মালিক মূলত তাঁর ভাইয়েরা; সিদ্দিকুর রহমানের নিজের তেমন কিছু নেই। তবে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের অনুসন্ধানে পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের নামে ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের আর্থিক লেনদেন এবং সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুদক ও পুলিশ অধিদপ্তরে দুটি অভিযোগ জমা দিয়েছেন দুলাল আহমেদ নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি। দুলাল আহমেদ জানিয়েছেন, এচক্রের সাথে মর্তুজা মেম্বারও জড়িত।
সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান কার্যক্রমে সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে ৩টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে সীমান্ত এলাকায় অবৈধ পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যে কোনো ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সিলেট সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান, হুন্ডি ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপরপরই পুলিশের নায়েক মো. সিদ্দিকুর রহমানকে শিল্প পুলিশে বদলি করে পুলিশ অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, পুলিশের নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের ব্যাংক হিসাব, তাঁর ভাই ও আত্মীয়স্বজনের আর্থিক লেনদেন, দুবাইয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং সীমান্তের চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা আছে কি না সে বিষয়ে দুদকে অভিযোগ করা হয়েছে।
সিলেট জেলার জকিগঞ্জ ও জৈন্তাপুর থানার দুই ওসির বিরুদ্ধে চোরাচালান, অবৈধ পণ্য পরিবহন এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, আলোচিত সীমান্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে: জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, বারুইবাজার, সোনারহাট, সুতারকান্দি ও হরিপুর। ওসি আব্দুর রাজ্জাক (জকিগঞ্জ থানা): বারুইবাজার, সোনারহাট ও সুতারকান্দি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় অবৈধ পণ্য পরিবহনে সহায়তার বিনিময়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩ কোটি টাকা ঘুষ বা বখরা আদায়ের অভিযোগ।

আপনার মতামত লিখুন :