চট্টগ্রামে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৩ এস্টেটে শুদ্ধি অভিযান, ৫৫ একর জমি গেজেটভুক্ত; অবৈধ দখল উচ্ছেদে যৌথ অভিযানের আহ্বান

06 মো: সাইফুদ্দিন চৌধুরী জুয়েল , উপ-সম্পাদক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম

চট্টগ্রামে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৩ এস্টেটে শুদ্ধি অভিযান, ৫৫ একর জমি গেজেটভুক্ত; অবৈধ দখল উচ্ছেদে যৌথ অভিযানের আহ্বান

ফাইল ফটো

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি বৃহৎ হাউজিং এস্টেট - হালিশহর, শেরশাহ ও ফিরোজশাহ আবাসিক এলাকায় পরিবেশ রক্ষা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। আবাসিক প্লটে অনুমতিবিহীন বাণিজ্যিক ব্যবহার, অবৈধ দখল, বকেয়া ভাড়া ও কিস্তি আদায় এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে মাঠে নেমেছে কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী নজরুল ইসলামের সার্বিক নির্দেশনায় এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীন।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তার পক্ষ থেকে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বকেয়া আদায় এবং পাহাড়ের পাদদেশ থেকে অবৈধ বসতি সরিয়ে নিতে কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে সঙ্গে নিয়ে আকবরশাহ, হালিশহর ও শেরশাহ এলাকা পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনকালে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৮০ দিনের বনায়ন কর্মসূচির আওতায় নতুন করে গাছ লাগানোর জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ইতোমধ্যে রসোনা পাহাড়, রাউজান, নোয়াখালী প্রকল্প ও অফিস ক্যাম্পাসে গাছ লাগানো হয়েছে।

 

আবাসিক প্লটে বাণিজ্য, কাঠা প্রতি ৩৫ লাখ টাকা আদায়

অনুমতিবিহীন বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীন বলেন, "সরকারি হাউজিং এস্টেটে প্লট বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও লীজ দলিলে স্পষ্ট শর্তারোপ করা আছে যে আবাসিক প্লটে বাণিজ্যিক কার্যক্রম করা যাবে না। তারপরও বরাদ্দ প্রাপকদের অনেকেই অনুমতি না নিয়ে দোকান, শোরুম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, যা বরাদ্দপত্র ও লীজ দলিলের শর্ত ভঙ্গের শামিল।"

তিনি জানান, এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রথমে সেবা গ্রহীতার প্রার্থীত সেবা বন্ধ রাখা হয়, নোটিশ দেওয়া হয় এবং পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়। অনেকেই নোটিশ পেয়ে বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। তবে যারা বৈধভাবে বাণিজ্যিক অনুমতি নিয়েছেন, বিশেষ করে জি-ব্লকের রাস্তার সম্মুখের প্লটগুলো থেকে বর্তমান হারে কাঠা প্রতি ৩৫ লক্ষ টাকা হারে ফি আদায় করা হচ্ছে।

 

সমন্বয়হীনতাই বড় বাধা, ৩ সংস্থার যৌথ অভিযানের দাবি

অবৈধ দখল ও বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধে প্রধান বাধা কী, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীদের একার পক্ষে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক অন্যান্য সংস্থা জমির শ্রেণী ও কাগজপত্র না দেখেই অবৈধ স্থাপনায় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দিচ্ছে। আবার সিটি কর্পোরেশন আবাসিক এলাকার মধ্যে ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী এ প্রসঙ্গে বলেন, "এই বিষয়ে সিডিএ নিয়মিত মনিটরিং করছে, সম্মানিত চেয়ারম্যান নিজে অভিযান পরিচালনা করছেন। আমরা সিডিএ চেয়ারম্যান ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ - এই ৩টি সংস্থা একত্রিত হয়ে অভিযান পরিচালনা করলে দ্রুত সুফল পাওয়া যাবে।"

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করলে এবং সেবা গ্রহীতারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে অবৈধ বাণিজ্যিক ব্যবহার ও দখলের প্রবণতা কমে আসবে।

৫৫ একর জমি উদ্ধার, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি

সরকারি জমি উদ্ধার প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৫৫ একর জমি গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চলছে। ভূমিদস্যু ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে তিনি বলেন, আগের তুলনায় দালাল অনেকটা কমেছে, তবে কিছু নব্য দালালের উৎপত্তি হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৯ সালের ভুয়া বরাদ্দপত্র, খন্ড প্লট, বরাদ্দ না পাওয়া অধিগ্রহণকৃত জমি জবর দখলে রাখা এবং বিকল্প প্লট বরাদ্দ করে দেওয়ার নামে একটি চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ঝামেলাপূর্ণ প্লট, ভুয়া বরাদ্দকৃত প্লট, পরিত্যক্ত বাড়ি ও দখলকৃত প্লট কেনাবেচার ক্ষেত্রে তারা অফিসে লোক পাঠায়।

"এই ক্ষেত্রে সেবা গ্রহীতারা যদি কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে ঢুকে নির্দেশনা মেনে নিজের কাজ নিজে করেন, তাহলে দালালদের প্রয়োজন হয় না। প্রবাসীরা সময়ের অভাবে আইনজীবীর মাধ্যমে কাজ করেন, সেটি ভিন্ন বিষয়। প্রকৌশল শাখা ও ভূমি শাখা দালাল ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে খুব কঠিনভাবে কাজ করছে।"

কৈবল্যধামে ভুয়া, দ্বৈত ও একাধিক বরাদ্দ কেলেঙ্কারি

চট্টগ্রামের আলোচিত কৈবল্যধাম প্রকল্পের জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এক সময় গরীবদের জন্য এই প্রকল্প করা হলেও অবস্থানগত কারণে চাহিদা বেশি থাকায় তা এখন মধ্যবিত্ত ও বড়লোকদের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। একই ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক প্লট বরাদ্দ নিয়ে রেখেছেন।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, "অতীতে কী হয়েছে তা বলতে চাই না। তবে আমার কর্মকালীন সময়ে কয়েকটি ভুয়া বরাদ্দ, দ্বৈত বরাদ্দ, একই প্লটের দুইজন দাবিদার, বরাদ্দকালীন নাম ও বয়সের গড়মিলের ঘটনা নজরে এসেছে। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মহোদয় কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রমাণ পাওয়া মাত্রই নোটিশ করে জবাব গ্রহণ ও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।"

এই কাজ করতে গিয়ে তারা রোষানলে পড়ছেন বলেও জানান তিনি। অনেকেই বয়স ও নামের সমস্যা জানতেন না বলে দাবি করছেন এবং বিভিন্ন নেতা-কর্মীর মাধ্যমে নামে-বেনামে উড়ো চিঠি দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করছেন। কর্মচারীদের নামেও মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে, এমনকি মিডিয়ায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন নির্বাহী প্রকৌশলী।

এ বিষয়ে বর্তমান মন্ত্রী ও চেয়ারম্যান মহোদয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে - সেবা প্রার্থীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং অবৈধ কার্যক্রমে জড়িতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।

Link copied!