সিলেটের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও জকিগঞ্জ সীমান্তকে কেন্দ্র করে ভারতীয় পণ্য চোরাচালান, হুন্ডি, দুবাই থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে এমজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণপাচার, মাদক ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে পুলিশের সদস্য নায়েক মো. সিদ্দিকুর রহমানসহ তিন থানার ১৭ জন পুলিশ সদস্য জড়িত বলে জানাগেছে। সিলেট সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য পরিবহনে সহযোগিতা, বিভিন্ন চেকপোস্টে অর্থ লেনদেন এবং প্রভাব খাটিয়ে চোরাচালান পাচারের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৪ কোটি কোটি টাকার লেনলেন করা হয়। বছরে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা এবং ৫ বছরে পায় ২৪০ কোটি টাকা লেনদেন করা হয়। এর মধ্যে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য নায়েক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান তিনটি ব্যাংক হিসাবে মাসে প্রায় চার কোটি টাকা লেনদেন হয়। এভাবেই গত ৫ বছর ধরে চোরাচালানের সাথে জড়িতে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে।
শতকোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে মোঃ সিদ্দিকুর রহমান তার ভাইদের কাছে দুবাই পাঠিয়েছে বলে জানাগেছে। পুলিশ সদস্য নায়েক মোঃ সিদ্দিকুর রহমানের তিন ভাই দুবাই স্থায়ীভাবে বসবাস করে। চাচাতো ভাই মিজানুর রহমান, প্রধান সহযোগী মরতুজ আলী মেম্বার (বর্তমান ইউপি সদস্য, ৮ নম্বর তোয়াকুল ইউনিয়ন, ১ নম্বর ওয়ার্ড, গোয়াইনঘাট, সিলেট)। তিনি দেশে পুলিশ সদস্য সিদ্দিকুর রহমানের সবচেয়ে বড় ও প্রধান সহযোগী হিসেবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
বৈদেশিক সংযোগ ও ব্যবসা (দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত): দুবাই শহরে বসবাসকারী এবং সেখানে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রধান সহযোগীরা হলেন, মুহিবুর রহমান, পুলিশ সদস্য সিদ্দিকুর রহমানের বড় ভাই। স্বর্ণপাচার চক্রের সদস্য মিজানুর রহমান হলেন পুলিশ সদস্য সিদ্দিকুর রহমানের চাচাতো ভাই। আরেক চক্রের নাজিম উদ্দিন হলেন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা তিনজনই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং যৌথভাবে বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
অন্যদিকে দেশে এই পুরো নেটওয়ার্ক ও কার্যক্রম সমন্বয় করেন পুলিশ সদস্য সিদ্দিকুর রহমান ও মরতুজ আলী মেম্বার। তাদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশপ্রধান বরাবর লিখিত আবেদন করেন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জালালীর এলাকার তোতাকুল গ্রামের বাসিন্দা দুলাল আহমদ। গোয়াইনঘাটসহ সীমান্তের বিভিন্ন পথ দিয়ে জিরা, ফুসকা, বিস্কুট, চকলেট, কসমেটিকস, থ্রিপিসসহ নানা ভারতীয় পণ্য দেশে প্রবেশ করছে। প্রতিদিন বালু ট্রাকের ভিতরে করে মাদক, কসমেটিক ও জিরা পাচার করছে। এ চক্রের সাথে জড়িত পুলিশের ১৫ সদস্য।
চোরাচালানের এ নেটওয়ার্ক শুধু সিলেটে সীমাবদ্ধ নয়; হবিগঞ্জসহ আশপাশের জেলায় এর বিস্তৃতি রয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের একাধিক ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক মাধ্যমে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়। কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় চার কোটি টাকা। পাঁচ বছর ধরে এভাবেই লেনদেন করা হয়। যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ ও বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করে অর্থ আদান-প্রদান, মুদ্রার নম্বর ও বিনিময়সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় এবং কথিত হুন্ডি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
সিদ্দিকুর রহমানের স্ত্রী ও ভাই দুবাই, জাপানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করছেন বলে জানিয়েছেন দুলাল আহমেদ নামের স্থানীয় ব্যক্তি। ২০২৩-২০২৪ সালের দিকে অভিযুক্তের সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সফরের তথ্য উল্লেখ করে তার বিদেশযাত্রার রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এদিকে পুলিশের নায়েক মোঃ সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে আরও ১৭ জনের একটি চোরাচালান চক্রের সদস্য জড়িত। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়ে সকল ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বিদেশযাত্রা ও আয়ের উৎস অনুসন্ধানের আবেদন করা হয়েছে।
জকিগঞ্জ-জৈন্তাপুর হয়ে চোরাচালানের বিস্তৃত রুট: প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সিলেটের জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, বারুইবাজার, সোনারহাট, সুতারকান্দি ও হরিপুর সীমান্তকে চোরাচালানের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব এলাকা থেকে শেরপুর, জালালাবাদ ও দক্ষিণ সুরমা হয়ে প্রতিনিয়ত মাদক ও চোরাচারানের পণ্য পরিবহনযোগে ঢাকায় নেওয়া হয়। সিলেট সীমান্ত থেকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে স্থানীয় লাইনম্যান ও মধ্যস্থতাকারীরা চোরাচালানকারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুসের বিনিময়ে পিকআপ ও ট্রাক বিভিন্ন চেকপোস্টে তল্লাশি না করে চেক পোষ্ট পুলিশ ছেড়ে দেন। চোরাচালানের তালিকায় চিনি, জিরা, সুপারি, কসমেটিকস ও মাদকদ্রব্যের নাম রয়েছে। দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ অনুসন্ধান করে জানতে পারে, জকিগঞ্জ থানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের একটি চক্রের মাধ্যমে বারুইবাজার, সোনারহাট ও সুতারকান্দি সীমান্তে অবৈধ পণ্য পরিবহনে সহযোগিতার অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে তিন থানা এলাকার ওসিদের সাথে মাসিক মাসোহারা করে প্রতিদিন ৫ কোটি টাকা লেনদেন করা হয়। এ ছাড়া জৈন্তাপুর থানার ওসি মাহবুবুল আলম মোল্লার বিরুদ্ধে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের নামে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। জৈন্তাপুর থানার ৫ কনস্টোবল, ৩ জন এসআই, ২ জন এএসআই বিভিন্ন রুট থেকে টাকা তুলেন।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখার একটি প্রশাসনিক আদেশে হবিগঞ্জ জেলা থেকে মো. সিদ্দিকুর রহমান নামে এক পুলিশ সদস্যকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। আদেশের স্মারক নম্বর ৪৪.০১.০০০০.০১২.১৯.১০৩.২৬-২০৯০। এতে মো. সিদ্দিকুর রহমানের বিপি নম্বর ২২১২৬০৩৬৫২৯ উল্লেখ করে প্রশাসনিক কারণে তাকে হবিগঞ্জ জেলা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে শিল্প পুলিশে বদলি করা হয়েছে । পুলিশের নায়েক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান দীর্ঘদিন সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় কর্মরত থেকে চোরাচালানের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সিলেট তার নিজ জেলা এবং গোয়াইনঘাট তার নিজ উপজেলা সেখানে চোরাচালানের সাথে জড়িয়ে কোটি কোটি টাকার মাদকসহ অবৈধ বিভিন্ন পন্য পাচার করছে।
দুলাল আহমদ নামের এক ব্যাক্তি এমন তথ্য প্রশাসনকে দেওয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তিনি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নায়েক সিদ্দিকুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন :