শিশুর নিরাপদ শৈশব গড়ার কারিগর হওয়ার কথা শিক্ষকের। অথচ সেই শিক্ষকের হাতেই ছয় বছরের শিশুর শৈশব ক্ষতবিক্ষত! শ্রেণিকক্ষের পবিত্রতা ছাপিয়ে ওঠা এমন নৃশংসতায় এবার আদালতের কঠোর রায়—সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা। জরিমানা না দিলে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ ধর্ষণের শিকার শিশুকে দেওয়ার নির্দেশ।
গাজীপুর মহানগরে নার্সারি শ্রেণির এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে আদর্শ শিশু কানন স্কুলের সহকারী শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন খানকে এ দণ্ড দিয়েছেন মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল। তবে রায় ঘোষণার দিনও আদালতে হাজির হননি অভিযুক্ত শিক্ষক। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবু বকর সিদ্দিক এ রায় ঘোষণা করেন। মামলার বিবরণে উঠে এসেছে, ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট সকালে প্রতিদিনের মতো স্কুলে গিয়েছিল শিশুটি। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে স্কুলে পৌঁছানোর পর বেলা ১১টার দিকে বাসায় ফিরে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। শরীরের বিশেষ অঙ্গ দিয়ে রক্তক্ষরণের কথা জানায় মাকে।
মায়ের কাছে শিশুটি জানায়, স্কুলের অন্য শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষ থেকে চলে যাওয়ার পর তাকে অফিসকক্ষে নিয়ে যৌন নির্যাতন করা হয়। অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে ভয়ভীতি ও হুমকিও দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরে শিশুটিকে স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঘটনার ভয়াবহতা জানার পর পরিবারের সদস্য ও স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে গাছা থানায় মামলা করেন শিশুটির মা।
সাত বছর পর আদালতের রায়-- গাজীপুর মহানগরের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের শরীফপুর এলাকার এ ঘটনায় অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন খান স্থানীয় করিম খানের ছেলে। তিনি আদর্শ শিশু কানন স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন।মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর সেলিনা বেগম। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মহিউদ্দিন ও জাকির কাদের।
রায়ের পর বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. মহিউদ্দিন বলেন, বাবা-মায়ের পর যেসব শিক্ষকের কাছে শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেই শিক্ষকের কাছেই শিশুর ধর্ষণের শিকার হওয়া অত্যন্ত কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সামাজিক অবক্ষয়ের নির্মম বার্তা--একটি শিশুর জন্য বিদ্যালয় হওয়ার কথা জ্ঞান, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আশ্রয়। অথচ সেই আশ্রয়েই যদি শিশুর শৈশব বিপন্ন হয়, তবে তা শুধু একটি অপরাধ নয়—সমাজের মূল্যবোধ ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও গভীর সতর্কবার্তা।
শিশুদের নিরাপত্তায় অভিভাবকের সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর নজরদারি এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি আবারও সামনে এনেছে গাজীপুরের এ ঘটনা। আদালতের রায় ন্যায়বিচারের বার্তা দিলেও পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :