দক্ষিণ কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া উপজেলার ব্যস্ততম আরাকান সড়কের কুতুপালং অংশ এখন অবৈধ বাজার, ঝুপড়ি দোকান ও যানবাহনের পার্কিংয়ের দখলে। সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান ও অবৈধ স্থাপনা। পাশাপাশি সড়কের ওপরই সারিবদ্ধভাবে রাখা হচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন। এতে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাতায়াতকারী বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি চক্র সড়ক দখল করে দোকান বসানো ও যানবাহন পার্কিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত টাকা আদায় করছে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশকে ম্যানেজ করে এসব অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিগগিরই যৌথ অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কুতুপালং বাজারের সড়কের উভয় পাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের দোকান। সড়কের পশ্চিম পাশে গড়ে উঠেছে ঝুপড়ি স্থাপনা। অন্যদিকে সিএনজি, ইজিবাইকসহ ছোট যানবাহন রাখা হচ্ছে সড়কের ওপর। ফলে যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে যানজট ভয়াবহ রূপ নেয়।
শুধু কুতুপালং নয়, কোটবাজার, মরিচ্যা বাজার, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালী বাজারেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ও সংশ্লিষ্টদের নীরবতার সুযোগে একটি চক্র সড়কের জায়গা দখল করে দোকান ও পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং প্রতিটি গাড়ি পার্কিংয়ের বিপরীতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এসব অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত করে অবৈধ বাজার ও পার্কিংয়ের কার্যক্রম চালু রাখা হচ্ছে।
এদিকে কুতুপালং বাজারের ইজারা নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা ও অভিযোগ। বাজারের অনিয়ম প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় সরকারের নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি দামে বাজার ইজারা নেওয়া এবং ইজারার মাধ্যমে বাজারের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রাখার পেছনে হেলাল উদ্দিন মেম্বারের পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে সর্বশেষ ২ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় সরাসরি বাজারটি ইজারা নিয়েছেন বোরহান উদ্দিন। কুতুপালং এলাকার আমিন নামের এক পথচারী বলেন, “বাজারে একটু যাওয়ার অর্থই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা। জরুরি রোগী নিয়েও অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়। সড়কের এক পাশে সিএনজি, অন্য পাশে ঝুপড়ি দোকান। এভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক চলতে পারে না।”
সড়কের ওপর অবৈধভাবে জাম্বুরা বিক্রি করা সৈয়দুর রহমান বলেন, “বাজারে জায়গা দিতে না পেরে আমাকে এখানে বসানো হয়েছে। আমি ২৫০ টাকা হাসিল (টোল) দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছি। এখানে আমার কোনো দোষ নেই। কুতুপালং উচ্চবিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে যেখানে পাঁচ মিনিট লাগার কথা, সেখানে যানজটের কারণে এক ঘণ্টা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। সকালে সড়কে গাড়ি প্রায় চলতেই চায় না। তাদের অভিযোগ, যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ে না।
বাজার এলাকার জাবেদ নামের এক চাকরিজীবী বলেন, “সকালে অফিসে যাওয়ার সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। কুতুপালং বাজারের যানজটে অনেক সময় নষ্ট হয়। সড়কটি এখন ব্যবসায়ী ও পার্কিংয়ের দখলে চলে গেছে। আমাদের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। কোটবাজারে সড়ক দখল করে ব্যবসা পরিচালনাকারী এক দোকানদার বলেন, “আমরা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এখানে দোকান করি। শখ করে তো সড়ক দখল করিনি। টাকার বিনিময়ে এখানে বাজার বসানো হয়েছে। প্রতিদিন প্রতিটি দোকান থেকে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা করে একজন সংগ্রহ করেন। টাকা দিয়েই আমরা এখানে নিরাপদে ব্যবসা করছি।”
গাড়ি পার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা এক লাইনম্যান বলেন, “এই পার্কিংয়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। কারা টাকা নেয়, তা আমরা জানি না। আমরা শুধু ওপরের নির্দেশ পালন করি। টাকা না দিলে এখানে গাড়ি পার্কিং করতে দেওয়া হয় না। কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুবেল বলেন, “আমরা চাই, অবৈধ দোকানগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করা হোক। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সকাল-বিকেল যানজট থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হলে বাজার ইজারাদারকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।”
এ বিষয়ে শাহপরী হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই ফজলুল হক জানান, কুতুপালং বাজারে যানজট নিরসনে বাজার সমিতি, ইজারাদারসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগিতায় শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোটবাজারের যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে এবং নিয়মিত অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, “এ বিষয়ে আমরা শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনা করব। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সড়ক দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ ঝুপড়ি দোকান ও পার্কিং উচ্ছেদের জন্য ইতিমধ্যে কাজ চলছে। যারা কুতুপালং সড়ক দখল করে বাজার বসিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাজারের মূল্যতালিকা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী ইজারা দেওয়ার শুরুতেই বাজারের মূল্যতালিকা প্রকাশ ও টাঙানোর কথা। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা করা হয়নি। আমি যোগদানের পরপরই বাজারের মূল্যতালিকা তৈরি করে অনুমোদনের জন্য কক্সবাজারে পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেয়ে এলে শিগগিরই তা প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দেওয়া হবে।”

আপনার মতামত লিখুন :